বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনসোমবার, ১১ মে, ২০২৬
স্বাস্থ্য

হান্টাভাইরাস কি পরবর্তী মহামারি হতে যাচ্ছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘুরতে বের হওয়া একটি জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা অত্যন্...

ChatGPT-Image-May-8-2026-03_04_34-PM

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘুরতে বের হওয়া একটি জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

এক মাস আগে আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজে থাকা বা এতে ভ্রমণের পর এখন পর্যন্ত তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে। চিকিৎসার জন্য আরও চারজনকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ভাইরাসটির সংস্পর্শে আসতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিমানে করে ফিরে গেছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি কম।

কীভাবে আলোচনায় এই ভাইরাস?

বিশ্বের দক্ষিণতম শহর আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে এমভি হন্ডিয়াস ১লা এপ্রিল যাত্রা শুরু করেছিল। ওশেনওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত এই বিলাসবহুল ক্রুজটি আর্জেন্টিনা থেকে ব্রিটিশশাসিত দক্ষিণ জর্জিয়া অঞ্চলে যাওয়ার কথা ছিল। জাহাজটি এমন এক সমুদ্রযাত্রায় ছিল যেখানে যাত্রীদের আটলান্টিকের সবচেয়ে দুর্গম ও অদেখা কিছু ভূখণ্ড অতিক্রম করে জীবনের সেরা এক ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রাথমিকভাবে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু এই জাহাজে ছিলেন বলে জানা গেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিপিন্স, রাশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ছিলেন এতে। গত ১১ এপ্রিল, একজন ডাচ ব্যক্তি জাহাজে মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ ছিল অজানা । প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ২৪শে এপ্রিল তার স্ত্রীর সঙ্গে সেন্ট হেলেনায় জাহাজ থেকে তার মরদেহ নামানো হয়। ওই নারীকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কর্তৃপক্ষ জানায় যে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে তিনি মারা গেছেন। এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিশ্চিত করেছে যে ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।পরবর্তীতে চলতি মাসের ২ তারিখ জাহাজের একজন জার্মান নাগরিক যাত্রীও মারা যান, ফলে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে তিন হয়।

গত বুধবার (৬ মে) দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ভাইরাসটির অ্যান্ডিস স্ট্রেইন, যা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ছড়ানোর জন্য পরিচিত, সেটি জাহাজ থেকে দেশে সরিয়ে আনা দুইজন ব্যক্তির শরীরে শনাক্ত করা হয়েছে। জাহাজটি সেন্ট হেলেনায় নোঙর করার পর সাতজন ব্রিটিশ নাগরিকসহ ৩০ জন যাত্রীও নেমে গিয়েছিলেন। তাদের সকলের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হন্ডিয়াস জাহাজের অপারেটর ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস।

তারা আরও জানিয়েছে যে, দুজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ নেদারল্যান্ডস থেকে আসছেন এবং কেপ ভার্দে থেকে জাহাজটির প্রত্যাশিত যাত্রার পর সম্ভব হলে তারা জাহাজটিতে আরোহণ করবেন।

পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলবর্তী দ্বীপপুঞ্জ কেপ ভার্দের কাছে তিন দিন নোঙর করে থাকার পর এমভি হন্ডিয়াস এখন স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাত্রা করছে।

হান্টাভাইরাস কী?

হান্টাভাইরাস বলতে এমন এক ধরনের ভাইরাসকে বোঝায়, যা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে থাকে। প্রধানত ইঁদুরের শুকনো মল থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণা শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর মতে, সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালা থেকে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণ ঘটে। যদিও বিরল, তবুও ইঁদুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।

এই ভাইরাস দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম বা এইচপিএস। এতে সাধারণত শুরুতে ক্লান্তি, জ্বর ও পেশিতে ব্যথা দেখা যায়। পরে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি এবং পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সিডিসি’র মতে, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।

দ্বিতীয় রোগটি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম বা এইচএফআরএস, যা আরও গুরুতর এবং প্রধানত কিডনিকে আক্রান্ত করে। পরবর্তী উপসর্গের মধ্যে থাকতে পারে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং কিডনি বিকলতা।

বিশ্বে কী পরিমাণ মানুষ হান্টাভাইরাসে সংক্রমিত হয়?

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের একটি প্রতিবেদনের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক এক লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে হান্টাভাইরাসের গুরুতর সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়, যার বড় অংশই ইউরোপ ও এশিয়ায়। আর এসব সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি সাধারণত চীনে ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে। তবে হান্টাভাইরাসের একটি প্রধান ধরন সিউল ভাইরাস বহন করে নরওয়ে ইঁদুর, যা ব্রাউন র‍্যাট নামেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী এই ইঁদুর দেখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থামহামারিহান্টাভাইরাস