জেন-জি প্রজন্মকে বুঝতে হিমশিম মায়েরা, বদলে যাচ্ছে কি সম্পর্কের সমীকরণ?
মা-সন্তানের সম্পর্ক বরাবরই ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আবেগের মিশেলে তৈরি। তবে সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্কের ধরনও বদলেছে। বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি প্রজন্...

মা-সন্তানের সম্পর্ক বরাবরই ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আবেগের মিশেলে তৈরি। তবে সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্কের ধরনও বদলেছে। বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি প্রজন্মের সন্তানদের সঙ্গে মায়েদের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং একইসঙ্গে জটিলও হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নতুন সামাজিক বাস্তবতা এই সম্পর্ককে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বলা হয় জেন-জি। বর্তমানে তাদের বয়স প্রায় ১৪ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই প্রজন্মকে ঘিরে মা-বাবাদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখন আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।
জেন-জি সন্তানের মা আফসারি খানম মিষ্টি মনে করেন, বর্তমান সময়ে মা-সন্তানের সম্পর্ক অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। একমাত্র সন্তান হওয়ায় তিনি ছোটবেলা থেকেই মেয়ের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করেছেন, যাতে সে একাকিত্ব অনুভব না করে। তবে তার মতে, সম্পর্ক যতই বন্ধুত্বপূর্ণ হোক, সন্তানকে ভালো-মন্দ ও শৃঙ্খলার ধারণা শেখানো জরুরি।
তবে “বন্ধু” শব্দটির ব্যবহারে কিছুটা ভিন্ন মত রয়েছে উদ্যোক্তা কাকলী তানভীরের। তিনি মনে করেন, মা-বাবা সন্তানের বন্ধু নন; বরং বন্ধুত্বপূর্ণ অভিভাবক। তার ভাষায়, সন্তান যদি মা-বাবাকে পুরোপুরি বন্ধু ভাবতে শুরু করে, তাহলে সীমারেখা বা শৃঙ্খলার জায়গাটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হয় কোথায় সম্মান দেখাতে হবে, কীভাবে আচরণ করতে হবে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কাকলীর মতে, বর্তমান প্রজন্মের অনেক সন্তান “না” শুনতে অভ্যস্ত নয়। অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের কারণে তারা বাস্তব জীবনের প্রত্যাখ্যান বা ব্যর্থতা সহজে নিতে পারে না। তিনি বলেন, “অনেকেই মনে করে পৃথিবীও তাদের ইচ্ছামতো চলবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ফলে চ্যালেঞ্জ এলেই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।”
অন্যদিকে জ্যোতি নামের এক অভিভাবক জানান, তার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধুর মতো নয়, আবার শুধুই কঠোর অভিভাবকসুলভও নয়। কৈশোরে সন্তানদের মধ্যে কিছু বিষয় গোপন রাখার প্রবণতা থাকে বলেও তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, এখনকার মায়েরা সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, কিন্তু অনেক সময় সন্তানরা এটাকে “অতিরিক্ত প্রশ্ন” হিসেবে দেখে বিরক্ত হয়।
অভিভাবকদের মতে, আগের প্রজন্মের মা-সন্তানের সম্পর্কের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সম্পর্কের বড় পার্থক্য হলো খোলামেলা যোগাযোগ। আগে পরিবারে ভয় ও সংকোচের জায়গা বেশি ছিল। শারীরিক বা মানসিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করতেন। এখনকার প্রজন্ম অনেক বেশি শেয়ার করতে চায় এবং মা-বাবারাও সন্তানদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেন।
তবে কিছু মা মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতিও দেখা যাচ্ছে। সংবাদকর্মী সঞ্চিতা নিজাম বলেন, এখনকার শিশুরা নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। একই পরিবারের সন্তানদের জন্যও আলাদা আলাদা খাবার তৈরি করতে হয়। তার মতে, এই প্রজন্ম নিজেদের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
শামীমা সুলতানা মনে করেন, ছোট পরিবারে বড় হওয়া সন্তানদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির অভ্যাস তুলনামূলক কম তৈরি হয়। আগে অনেক ভাইবোনের মধ্যে বেড়ে ওঠার কারণে দায়িত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠত।

প্রযুক্তিও এই সম্পর্কের একটি বড় প্রভাবক হিসেবে উঠে এসেছে। অনেক অভিভাবক বলছেন, এখনকার সন্তানরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসেও ফোন বা ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটায়। ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও এক ধরনের মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
জ্যোতি বলেন, “আমাদের সময় কাজিনরা একসঙ্গে হলে গল্পের শেষ হতো না। এখন দেখি সবাই যার যার ফোনে ব্যস্ত।”
তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখেন না কাকলী তানভীর। তার মতে, প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তানদের কাছ থেকেও নতুন কিছু শেখা যায়। তবে একইসঙ্গে সন্তানদের সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি। তিনি বলেন, অভিভাবকদেরও ডিজিটাল জগত সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন, না হলে সন্তানরা সহজেই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. কামাল উদ্দিন মনে করেন, এই প্রজন্মগত পার্থক্য নতুন কিছু নয়। তার ভাষায়, “জেনারেশন গ্যাপ সব সময়ই ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। আজকের তরুণরাও একদিন তাদের সন্তানের সঙ্গে একই ধরনের দূরত্ব অনুভব করবে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্ম “ডিজিটাল নেটিভ”- তারা প্রযুক্তির ভেতরেই বড় হয়েছে। আর আগের প্রজন্ম “ডিজিটাল মাইগ্র্যান্ট”, যারা পরে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাই চিন্তা-চেতনা ও জীবনধারায় পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক।
সবশেষে মায়েদের প্রত্যাশা একটাই- সন্তানরা যেন ভালো মানুষ হয়ে ওঠে। তারা চান, নতুন প্রজন্ম মানবিক, দায়িত্বশীল ও সম্মানবোধসম্পন্ন হোক; মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিতে শিখুক।


