বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনরবিবার, ১০ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

মা দিবসে শূন্য কোলে মায়েরা, ছবি বুকে নিয়ে কাটে যাদের প্রতিটি দিন

মা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে শুভেচ্ছা, ফুল আর ভালোবাসার গল্পে। কেউ মায়ের হাত ধরে ছবি তোলে, কেউ দূরে থেকেও ফোনে জানায় কৃতজ্ঞতা। কিন্তু এই...

fgh

মা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে শুভেচ্ছা, ফুল আর ভালোবাসার গল্পে। কেউ মায়ের হাত ধরে ছবি তোলে, কেউ দূরে থেকেও ফোনে জানায় কৃতজ্ঞতা। কিন্তু এই উৎসবের দিনেই দেশের অসংখ্য মা নীরবে ভেঙে পড়েন। কারণ তাদের কোলে আর সন্তান নেই। আছে শুধু স্মৃতি, অপেক্ষা আর অসহনীয় শূন্যতা।

আব্রাহাম লিংকনের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে- ‘যার মা আছে সে কখনই গরীব নয়।’ অর্থাৎ কেবল মায়ের আশ্রয় থাকলেই বন্ধুর পথের নানা বিপদ পাড়ি দেওয়া যায় সহজেই। তবে যে মায়েদের সন্তান তাদের ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে , কেমন আছেন তারা?

কোনো মা সন্তান হারিয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনায়, কেউ আগুনে পুড়ে, কেউ ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডে। আবার কেউ প্রবাসে থাকা সন্তানের মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রতিদিন একটু একটু করে বেঁচে আছেন। মা দিবস তাদের কাছে আনন্দ নয়; বরং বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষতের নতুন করে জেগে ওঠার দিন।

হামে আক্রান্ত আট মাস বয়সী শিশু ইরফান আহমেদকে সুস্থ করে তোলার আশায় প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়া থেকে তাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মা। ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তার মৃত্যু হয়। ইরফানের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। বার বার ইরফানের নাম ধরে ডাকছিলেন সাড়া পাওয়ার জন্য। হাম ও হামের উপসর্গে একের পর এক শিশুর মৃত্যুতে ভারাক্রান্ত ৩ শতাধিক পরিবার। মৃত শিশুদের পরিবারগুলোর অভিযোগ- সময়মতো টিকা না পাওয়ায় তাদের সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে সন্তানহারা এসব মায়ের কান্নায় ভারী আজকের মা দিবস।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে নিহত হওয়া তরুণী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মা এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, তার মেয়ে আর ফিরবে না। বৃষ্টির মা জানান, বিদেশে মেয়েকে পাঠিয়েছিলেন ভালোর আশায়। মেয়েটি প্রতিদিন ফোন করত, মায়ের ওষুধ খাওয়ার খবর নিত। সেই কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই থেমে গেছে। এখন প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙলে তিনি কিছু সময় ভুলে যান- মেয়ে নেই। তারপর বাস্তবতা মনে পড়তেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

শুধু বৃষ্টির মা নন, এমন অসংখ্য মা আছেন যাদের সন্তান নানা সহিংসতা, অবহেলা আর অপরাধের শিকার হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। রাজধানীর একটি বস্তিতে বসবাস করা এক মা বলেন, তার ১২ বছরের ছেলেটি কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আগুনে মারা যায়। মা দিবসে ছেলের পুরোনো জামাটা বের করে তিনি শুধু কাঁদেন। “ও বলত, বড় হয়ে আমাকে আর কষ্ট করতে দেবে না,”- কথাটা বলতে বলতেই ভেঙে পড়েন তিনি।

সবচেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান সেই মায়েরা, যাদের সন্তান ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। সমাজ কিছুদিন প্রতিবাদ করে, সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করে, তারপর ধীরে ধীরে সব থেমে যায়। কিন্তু মায়ের কান্না থামে না। কুমিল্লার এক মা বলেন, “মানুষ বিচার চায়, আমি শুধু আমার মেয়েকে চাই।” মেয়েটির বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। খেলতে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেনি। পরে তার মরদেহ পাওয়া যায় পাশের একটি ঝোপে। মা দিবস এলেই তিনি মেয়ের চুল বাঁধার ফিতা হাতে নিয়ে বসে থাকেন। তিনি বলেন , ‘আমি এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি দৌড়ে এসে বলবে—মা, খেতে দাও।’

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তানের মৃত্যু কোনো মায়ের পক্ষেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে হত্যা, ধর্ষণ বা দুর্ঘটনার মতো আকস্মিক ঘটনায় সন্তান হারালে মায়েরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতে ভোগেন। অনেকেই বিষণ্নতা, অনিদ্রা কিংবা অপরাধবোধে আক্রান্ত হন। তাদের মনে হতে থাকে- আরেকটু সতর্ক হলে হয়তো সন্তানকে বাঁচানো যেত।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মা দিবসে আমরা সাধারণত মায়েদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ দেখি, কিন্তু সন্তানহারা মায়েদের বেদনা খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ এই মায়েদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা, মানসিক সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশে শিশু হত্যা, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা প্রবাসে মৃত্যুর ঘটনা যেন ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে তৈরি হচ্ছে একেকটি নিঃস্ব পরিবার, একেকজন শূন্য কোলে মা। সংবাদপত্রের কয়েকটি লাইনে হয়তো একটি মৃত্যুর খবর শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন মায়ের কাছে সেই মৃত্যু প্রতিদিনের বাস্তবতা। মা দিবসে অনেক মা সন্তানের দেওয়া উপহার হাতে পান। আর সন্তানহারা মায়েরা হাতে নেন পুরোনো ছবি, জামা কিংবা খেলনা। কেউ সন্তানের কবরের পাশে বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ রাতভর ফোনের পুরোনো ভয়েস রেকর্ড শোনেন। তাদের কাছে মা দিবস মানে- হারিয়ে যাওয়া ডাকগুলোর স্মরণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইনি বিচার নয়, সন্তান হারানো পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও জরুরি। কারণ এই শোক একা বহন করা প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি শিশু নিরাপত্তা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং সড়ক নিরাপত্তায় কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এমন কান্না থামবে না।

এই মা দিবসে যখন পৃথিবীর বহু মা সন্তানের আলিঙ্গনে হাসবেন, তখন দেশের কোনো এক প্রান্তে হয়তো একজন মা নিঃশব্দে সন্তানের ছবি বুকে চেপে কাঁদবেন। তার কান্না শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি আমাদের সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। মা দিবসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো সেখানেই- যে মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন, তাদের চোখের জল মুছতে আমরা আসলে কতটা পেরেছি?

মা দিবসমৃত্যুসংবাদশূন্য কোলসন্তানহারা