বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনরবিবার, ১০ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

নিজের সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলার নামই কি আর্দশ মা?

মায়েদের জীবন মানেই সংসার, সন্তান আর আত্মত্যাগের এক নীরব অধ্যায়। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, বদলেছে পরিবারের কাঠামোও। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত- প্রতিটি...

maa-big20160507190234

মায়েদের জীবন মানেই সংসার, সন্তান আর আত্মত্যাগের এক নীরব অধ্যায়। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, বদলেছে পরিবারের কাঠামোও। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত- প্রতিটি প্রজন্মের মায়ের নিজের সময়ের সঙ্গে লড়াই করে সন্তানকে আগলে রাখা। লড়াইয়ের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। সবসময়ই তাকে কেউ একজন কানে কানে বা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে- মায়েদের সব মেনে নিতে হয়, মাকেই তো ছাড় দিতে হবে, মায়ের চাওয়া পাওয়া থাকলেও বলতে নেই। কিন্তু শক্ত স্বরে এ সমাজকে এটা বলতে শোনা যায় না- মা হয়েছে বলেই ব‍্যক্তি অধিকার ক্ষুন্ন হতে পারে না।

আশির দশকের মায়েদের কথা ভাবলে চোখে ভেসে ওঠে এক অনবরত ব্যস্ত নারীর ছবি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রান্না, কাপড় ধোয়া, অতিথি সামলানো, পরিবারের সবার চাহিদা পূরণ- সবকিছুই ছিল তাদের দায়িত্ব। তখন বেশিরভাগ পরিবার ছিল যৌথ। সংসারে লোকসংখ্যা বেশি, কাজও বেশি। কিন্তু সেই মায়েরা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা ক্লান্তিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। সন্তানদের মানুষ করাই ছিল তাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য। নিজের জন্য আলাদা কোনও সময় বা পরিচয় দাবি করাটা তখন অনেকের কাছেই বিলাসিতা ছিল।

নব্বইয়ের দশকে এসে সমাজে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। একক পরিবার বাড়তে থাকে। শহরমুখী জীবন, চাকরির চাপ, সীমিত পরিসরের সংসার – সব মিলিয়ে মায়েদের দায়িত্বের ধরন পাল্টে যায়। আগে যেখানে সংসারের কাজে ভাগাভাগি করার মতো মানুষ থাকত, সেখানে এখন একজন মাকেই একা সামলাতে হয়েছে প্রায় সবকিছু। সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনও বদলাতে শুরু করে। শুধু শাসন নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। পড়াশোনা, মানসিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা—সবদিকে সন্তানের পাশে থাকার চাপও বেড়ে যায়।

বর্তমান সময়ের মায়েদের জীবন যেন আরও বহুমাত্রিক। সকালে সন্তানের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, স্কুলগেটের উদ্বেগ, তারপর দ্রুত অফিসে ছোটা- এই বাস্তবতা এখন বহু মায়ের প্রতিদিনের গল্প। অফিস শেষে আবার বাসায় ফিরে সংসার সামলানো, সন্তানের পড়াশোনা দেখা, অনলাইন জগতের ঝুঁকি থেকে সন্তানকে নিরাপদ রাখা—সবকিছুই একসঙ্গে করতে হচ্ছে তাদের। প্রযুক্তির এই যুগে সন্তানকে শুধু বড় করাই নয়, তাকে নিরাপদ ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখাটাও বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিশ্চয়ই আজকের বাবারা আগের চেয়ে অনেক বেশি অংশ নিচ্ছেন সন্তান পালন ও ঘরের কাজে। তবু সমাজ এখনও মায়ের কাছেই নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা রাখে। সন্তান অসুস্থ হলে প্রথম প্রশ্ন ওঠে মায়ের দিকে, সন্তানের ফলাফল খারাপ হলেও দায়টা এসে পড়ে তার ওপরই।

প্রজন্ম বদলেছে, জীবনযুদ্ধের ধরন বদলেছে, কিন্তু মায়েদের স্বতঃস্ফূর্ত বা চাপিয়ে দেওয়া ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ বদলায়নি। শুধু প্রতিটি সময় তাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এনে দাঁড় করিয়েছে। আর প্রতিটি প্রজন্মের মা নিজের মতো করে সেই লড়াই করে গেছেন নীরবে।

এই স্টেরিওটাইপ ভাঙতে মায়েদের ‘অলৌকিক সুপারহিউম্যান’ নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে। যেখানে মা শুধু সন্তানের জন্য আত্মত্যাগী চরিত্র নন, বরং তার নিজস্ব স্বপ্ন, হতাশা, একাকীত্ব, মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত পরিচয়ও আছে।
ভালো মা বা আদর্শ মা বলতে বাস্তবে একজন নিখুঁত মানুষ নয়; বরং এমন একজন মানুষ, যিনি সীমাবদ্ধতা থাকা স্বত্বেও ভালোবাসা, যত্ন ও দায়িত্ব দিয়ে সন্তানকে বড় করার চেষ্টা করেন। মা কে কোন প্রতীক হিসবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। মায়েদেরও স্বপ্ন আছে, আত্মপরিচয় আছে, বিরক্তি আছে। মা হওয়ার বাইরেও তার একটা আলাদা জীবন আছে । আমরা মায়েদের ‘আদর্শ মা’ হওয়ার সীমাবদ্ধতায় আটকে ফেলব না ।

আত্মত্যাগআর্দশ মাসত্ত্বাসংসার