বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
বিবিধ

স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া কি আসলেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে?

b71769f8-766b-4690-8df9-2d838c1ff5e0

দেশে প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (সংশোধিত) অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে সালিশি কাউন্সিলের (Arbitration Council) লিখিত অনুমতি নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তা আইনত দণ্ডনীয়, তবে ধর্মীয়ভাবে তা অবৈধ বা বাতিল হয় না, কিন্তু আইনি জটিলতা তৈরি হয়।

চলতি বছরে বাংলাদেশের মুসলমানদের দ্বিতীয় বিয়ে করতে আর স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, এরকম একটি সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। আদালতের আদেশে আসলে কী বলা হয়েছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

তবে আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের একটি বিষয় বাংলাদেশের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে উঠলেও মুসলিমদের পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতির যে বিধান আগে ছিল সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই আবার বিয়ে করা যাবে এমন দাবি সঠিক নয় বলেই জানিয়েছেন তারা।

গত ডিসেম্বরে রিটের ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, আবার বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি বা অনুমতি নেওয়ার যে নিয়ম ছিল তাতে কোনো পরিবর্তনই আসেনি।

‘আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিশি পরিষদের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে নিবন্ধিত হবে না। আবার ওই কাউন্সিলে কাউকে পুনরায় বিয়ের আবেদন করতে হলে অবশ্যই আবেদনের সাথে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আবু নাসের মোঃ ওয়াহিদ বলছেন, পুনরায় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’ বলে যে প্রচার চলছে তা সম্পূর্ণ ভুল, বরং হাইকোর্টের রায়ে স্ত্রীর সম্মতিসহ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমেই বিয়ের অনুমতির যে পদ্ধতি সেটিকেই যৌক্তিক বলা হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় স্ত্রী বা স্বামীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হবে বলা হলেও পরে পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়। সেখানে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ স্পষ্ট করা হয়।
এ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তির একটি বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় সালিশ পরিষদের পূর্বানুমতি ছাড়া পুনরায় বিয়ে করতে পারবেন না এবং এরকম অনুমতি ছাড়া কোনো বিয়ে সম্পন্ন হলে তা রেজিস্ট্রি করা যাবে না।

এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরও বিয়ে করতে হলে সালিশ পরিষদের অনুমতি নিতে হবে। সেজন্য নির্ধারিত ফি দিয়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে চেয়ারম্যানের (বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে শেষ স্ত্রীর এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) কাছে আবেদন করতে হবে। এবং আবেদনপত্রে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ, প্রয়োজনীয়তা এবং এ বিয়ের বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা তা লিখতে হবে।

কোনো পুরুষ সালিশ পরিষদের অনুমতি ছাড়া যদি আরও একটি বিয়ে করেন, তাহলে তাকে (ক) অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সমস্ত দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরিশোধ করা না হলে তা বকেয়া রাজস্বের মত আদায় করা যাবে; (খ) অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত


আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে এই রিট মামলা করেন, সযখানে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল চাওয়া হয়।

এর মধ্য দিয়ে কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টিকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়। হাই কোর্ট সে সময় প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করে। সেই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতবছর রায় ঘোষণা করা হয়।

পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন থেকে উদ্ধৃত করে রায়ে বলা হয়, “এতে দেখা যায়, ইসলামী আইন বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও, যেখানে কোনো পুরুষ দুই বা ততোধিক স্ত্রীর অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করতে অক্ষম হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেখানে ‘একজনকেই বিবাহ করার’ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে ইসলামী আইনশাস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (ইজতিহাদ বা স্বাধীন আইনগত ব্যাখ্যার মাধ্যমে) মত দিয়েছেন যে, অধিকাংশ পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ থেকে বিরত থাকাই উত্তম।”

‘বাংলাদেশে প্রযোজ্য হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত; তবে তা নির্ভরশীল একজন পুরুষের ন্যায়পরায়ণতা ও একাধিক স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার আর্থিক সক্ষমতার ওপর।’

সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আদালত বলেছে, বাংলাদেশে বহুবিবাহ সংক্রান্ত বিষয়টি নিম্নরূপে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যেতে পারে:

১। অনুমোদনযোগ্যতা: ইসলামে বহুবিবাহ অনুমোদিত এবং হানাফি মাজহাব এটিকে একটি বৈধ প্রথা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
২। মূল শর্ত: এই প্রথা তখনই অনুমোদিত, যখন স্বামী একাধিক স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করতে সক্ষম হন এবং তাদের ভরণপোষণের জন্য আর্থিকভাবে সক্ষম থাকেন।
৩। ন্যায়বিচারের বাধ্যবাধকতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ন্যায়পরায়ণ হওয়ার সক্ষমতা, যার মধ্যে সময়, উপহার এবং অন্যান্য বস্তুগত বিষয়ে সমান আচরণ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।
৪। যখন সুপারিশযোগ্য নয়: যদি কোনো পুরুষ আশঙ্কা করেন যে তিনি ন্যায়বিচার করতে পারবেন না, তবে তার উচিত বহুবিবাহ থেকে বিরত থাকা এবং এক স্ত্রীর মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকা; কারণ এটিই আদর্শ ও উত্তম বিকল্প।

রায়ে হাই কোর্ট বলেছে, ‘এটি স্পষ্ট যে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার অধীনে আরেকটি বিবাহের অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এই আইন কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ের) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না; একই সঙ্গে এটি সালিশ পরিষদের জন্য বহুবিবাহের অনুমতি প্রদান বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতাও আরোপ করে না।’

‘এর অর্থ এই নয় যে, ধর্ম পালন, চর্চা ও প্রচারের অধিকার আইন দ্বারা কেড়ে নেওয়া যেতে পারে; বরং এর অর্থ হল— সংসদ আইন দ্বারা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ, চর্চা ও প্রচারের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’

আইনবিবাহমুসলিম