বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনরবিবার, ১০ মে, ২০২৬
নারী

মায়ের নীরব যুদ্ধে তিন সন্তানের সফলতা

শাহনাজ বেগম একজন সত্যিকারের মহীয়সী নারী। বর্তমানে বয়স ৪৫ বছর। কিন্তু জীবনের যে কঠিন সংগ্রাম তিনি একা বয়ে বেড়িয়েছেন, তা অনেকের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন।ছ...

oppo_34

শাহনাজ বেগম একজন সত্যিকারের মহীয়সী নারী। বর্তমানে বয়স ৪৫ বছর। কিন্তু জীবনের যে কঠিন সংগ্রাম তিনি একা বয়ে বেড়িয়েছেন, তা অনেকের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন।

ছোটবেলাতেই তিনি নিজের মাকে হারান। এরপর সৎ মায়ের কাছে বড় হয়েছেন নানা অভাব ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে। খুব অল্প বয়সে সংসারজীবন শুরু করেন। মাত্র নয় বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি তিন সন্তানের মা হন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- এক সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই তার স্বামী মারা যান। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার এক অসীম সংগ্রামের জীবন।

স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে বুকে আগলে তিনি জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েন। নিজের সব স্বপ্ন, শখ ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়াকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নেন। মানুষের বাসায় কাজ করা থেকে শুরু করে , হাসপাতালে এবং একটি কেজি স্কুলে চাকরি করেছেন শুধুমাত্র সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য।

অল্প বয়সে স্বামী হারানোর পর সমাজের অনেকেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনও নতুন করে সংসার করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। সন্তানদের মানুষ করাই ছিল তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। সন্তানের লেখাপড়া ও সংসার চালিয়ে যেতে মাত্র ১৫০০ টাকা বেতনের চাকরি শুরু করেন। এই ১৫০০ টাকার বেতন দিয়ে ৩ সন্তান নিয়ে দরিদ্র্য জীবন-যাপন করেছেন। তার কাছে অনেক সুযোগ ছিলো, নিজের কথা ভেবে বিয়ে করে নেয়ার। কিন্তু তার সন্তানদের সত্যিই কেউ গ্রহণ করে সেই ভালোবাসা দিবে এই ভরসা পাননি বলে একাই লড়ে গেছেন জীবন যুদ্ধ।

তার সেই ত্যাগ বৃথা যায়নি। আজ তার দুই ছেলে চাকরি করছে এবং মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- এ অধ্যয়নরত। আজ তার ছেলেমেয়েরা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে শুধুমাত্র তাদের মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসার কারণে।

তবে এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি নিজের কষ্টগুলো কখনো প্রকাশ করেননি। অসংখ্য রাত মায়ের কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙেছে তার সন্তানদের। মা কেন কাঁদছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সবসময় শাহনাজ বেগম চোখ মুছতে মুছতে উত্তর দিয়েছে কিছু হয়নি, এমনি কাঁদছি। তখন সন্তানরা ছোট ছিলো তাই এটা বিশ্বাস করে আবার ঘুমিয়ে যেতো। তবে এখনো তিনি কান্না করেন। এখন হয়তো সন্তানরা বুঝতে পারে, বাবার জন্যে চোখের পানি পরে এখনো মায়ের।

আজ শাহনাজ বেগমের সন্তানদের সবচেয়ে বড়ো পাওয়া, সন্তানদের সফলতা। শাহনাজ বেগমের মেয়ে জানান, ‘আমার মায়ের একটি ইচ্ছা আছে, তার নিজের নামে একটি বাড়ি হবে। আমি বিশ্বাস করি, যেদিন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারব, সেদিনই নিজেকে সত্যিকার অর্থে সফল ও স্বার্থক মনে হবে। সেদিন আমার মাকে আমি মন ভরে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবো। এবারের মতো এই শুখনো ভালোবাসাটুকু দিয়েই বলছি, ‘মা দিবসের শুভেচ্ছা মা। হাজার বছর বাঁচো মা’।’

নীরব যুদ্ধমাসফলতা