গল্প, অনুভূতি আর বাস্তবতার ট্রেন : বনলতা এক্সপ্রেস

বনলতা এক্সপ্রেস মূলত কিছুক্ষণ থেকে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র, যা নিজেকে শতভাগ খাঁটি বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের ফলে এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং একটি সাহিত্যনির্ভর শিল্পকর্ম হিসেবেও দাঁড়িয়েছে।
ছবিটির নামকরণ ছিল বিশেষভাবে সৃজনশীল। ‘এক্সপ্রেস’ শব্দটি যেমন দ্রুতগামী ট্রেনের ধারণা দেয়, তেমনি গন্তব্যকেন্দ্রিক, পরিবারমুখী যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে। এই ভাবনাটি ছবির গল্প ও আবহের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলে গেছে। মূল উপন্যাসের নাম সরাসরি ব্যবহার না করে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নামটি বেছে নেওয়া নির্মাতার এক সফল সৃজনশীল সিদ্ধান্ত।
বিনোদন মানেই যে শুধু নাচ, গান বা অ্যাকশন- এই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে এই চলচ্চিত্র। এখানে গল্পই মূল চালিকাশক্তি। ছবির প্রথমার্ধে প্রাণবন্ত হাস্যরস দর্শককে আকৃষ্ট করে, আর বিরতির পর গল্পের মোড় বদলে তৈরি হয় গভীর আবেগময় পরিবেশ। এই ভারসাম্যপূর্ণ নির্মাণই ছবিটিকে করে তুলেছে পূর্ণাঙ্গ বিনোদন।

চরিত্রের বৈচিত্র্য ছবিটির অন্যতম শক্তি। মা-ছেলে, দম্পতি, বন্ধু, শিশুচরিত্র থেকে শুরু করে ট্রেনের কর্মচারী- সবাই মিলে একটি সমন্বিত গল্প তৈরি করেছে। কার স্ক্রিনটাইম বেশি বা কম- তা নয়, বরং প্রত্যেকের উপস্থিতির যথার্থতা ছবিটিকে শক্তিশালী করেছে। নির্মাতা দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি চরিত্রকে তাদের প্রয়োজনীয় জায়গায় উপস্থাপন করেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ-এর লেখনীর যে বৈশিষ্ট্য- বিভিন্ন বিষয় যেমন রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান বা জীবনদর্শনকে সংলাপের মাধ্যমে তুলে ধরা—সেটি ছবিতেও বজায় রয়েছে। সংলাপে যেমন হাস্যরস আছে, তেমনি রয়েছে গভীর জীবনবোধ, যা দর্শককে ভাবায়।
মাল্টিকাস্টিংয়ের দিক থেকেও ছবিটি সমৃদ্ধ। মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, সাবিলা নূর, শরিফুল রাজ, শ্যামল মওলাসহ আরও অনেক তারকার সম্মিলন ছবিটিকে করেছে প্রাণবন্ত। প্রত্যেকে নিজ নিজ চরিত্রে যথাযথ অবদান রেখেছেন।

সংগীতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। আইয়ুব বাচ্চু-এর কালজয়ী গান ‘উড়াল দেবো আকাশে’-র পুনর্নির্মাণ, রবীন্দ্রসংগীত এবং মৌলিক গান—সব মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ সাউন্ডস্কেপ তৈরি হয়েছে। ট্রেনের ভেতরের দৃশ্যের বাস্তবতা এবং বাইরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিশেষ করে জোছনার দৃশ্য, চলচ্চিত্রটিকে ভিজ্যুয়ালি আকর্ষণীয় করেছে।
সব মিলিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা দর্শকের মনে দাগ কাটে এবং পুনরায় দেখার আগ্রহ তৈরি করে। গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শেষে ছবির একটি গভীর সংলাপ মনে করিয়ে দেয় জীবনের সারকথা—
“জন্মের সময় আমাদের কানে আযান দেওয়া হয়, মৃত্যুর পর দেওয়া হয় না- তখন হয় নামাজ। এই আযান আর নামাজের মধ্যবর্তী সময়টাই আমাদের জীবন।”



