বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

ঘুম আসে না চোখে, পাশেই নাক ডাকে সঙ্গী- নারীদের অনিদ্রার পেছনের কারণ কি?

sleeping-at-night

ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলেও ঘুমিয়ে পড়া সবার জন্য সহজ নয়। অনেকেই সময়মতো শুয়ে পড়ার পরও এপাশ-ওপাশ করতে করতে রাত গভীর করে ফেলেন। গবেষণা বলছে, এই সমস্যা পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেশি তীব্র। অনেক নারীর-ই পরিচিত অভিজ্ঞতা— কথা বলতে বলতে পাশের মানুষটি হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছেন, অথচ তার নিজের চোখে ঘুম আসছে না। কেন এমন হয়? যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্লিপ ফাউন্ডেশন’ গবেষণার ভিত্তিতে দাবি করেন, এমন পরিস্থিতি পুরুষের তুলনায় নারীদের জন্য বেশি তীব্র। ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ঘুম তুলনামূলকভাবে হালকা ও ভঙ্গুর হওয়ার পেছনে রয়েছে জৈবিক ও মানসিক নানা কারণ।

কেন নারীদের ঘুমে ব্যাঘাত বেশি?

হরমোনের ওঠানামা: নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থায় কিংবা মেনোপজের সময় এই পরিবর্তন আরও বেশি হয়, যা ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয় এবং মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

স্ট্রেস হরমোন বনাম ঘুমের হরমোন : কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) ও মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) একে অপরের ভারসাম্যে কাজ করে। নারীদের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বেশি থাকলে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে শরীর ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে দেরি করে। একই সঙ্গে মেলাটোনিনের উৎপাদন কমে গেলে ঘুমের ছন্দও বিঘ্নিত হয়।

মানসিক চাপ ও আবেগ : নারীরা সাধারণত বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ায় তাদের মানসিক ওঠানামা ঘন ঘন ঘটে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবার, কাজ—সব মিলিয়ে নানা দুশ্চিন্তা ঘুমের আগে মাথায় ঘুরতে থাকে, যা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়াকে কঠিন করে তোলে।

দ্বৈত দায়িত্বের ক্লান্তি: অনেক নারী একই সঙ্গে কর্মজীবন ও সংসার সামলান। শিশুর যত্ন, বয়স্কদের দেখাশোনা, অফিসের কাজ—সব মিলিয়ে মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে অনিদ্রার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শারীরিক সমস্যা ও স্বাস্থ্যগত কারণ: থাইরয়েড সমস্যা, মাইগ্রেন, বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় শারীরিক অস্বস্তিও ঘুম কমিয়ে দেয়।

এর প্রভাব কী?


ঘুমের ঘাটতি শুধু ক্লান্তিই বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন—

-মনোযোগ কমে যাওয়া

-বিরক্তি ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি

-রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

-হরমোনের আরও ভারসাম্যহীনতা

কীভাবে সমাধান সম্ভব?


অনিদ্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি—

নিয়মিত ঘুমের রুটিন:
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জাগার অভ্যাস শরীরের জৈব ঘড়িকে ঠিক রাখে।

ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখা:
শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখা ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক।

খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা:
ঘুমানোর আগে ভারী খাবার বা ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উচিত।

স্ক্রিন টাইম কমানো:
মোবাইল বা টিভির আলো মেলাটোনিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাই ঘুমানোর আগে এসব ব্যবহার কমানো জরুরি।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ:
ধ্যান, হালকা ব্যায়াম বা বই পড়ার মতো অভ্যাস ঘুমের আগে মনকে শান্ত করতে সাহায্য করে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুমের সমস্যা চলতেই থাকে, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, বা দিনের কাজ ব্যাহত হয়—তবে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, এটি সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। তাই ঘুমের সমস্যা ছোট মনে না করে সময়মতো সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অনিদ্রানারী