জাতীয় সংসদে হামের টিকা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা-এর বক্তব্যের বিপরীতে সামাল দেওয়ার কথা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামে শিশুমৃত্যু, টিকার ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা, টিকা পরিবহনকারীদের ৯ মাসের বেতন বকেয়া, বিভিন্ন জেলায় জনবলসংকট ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ডোন্ট গেট নার্ভাস, আই এম ফিট’—প্যানিক না ছড়িয়ে তথ্য যাচাই করে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি তো ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছি, ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে না।’ সংসদে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাও যদি ভয়ের কারণ হয়, তাহলে সংসদ কীভাবে চলবে। রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘এই মৃত্যুগুলোকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে হবে না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি শিশুর জীবন, একটি মায়ের কান্না, একটি পরিবারের ধ্বংস।’ তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার মতো ভার পৃথিবীতে আর কিছু নেই—এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি দেখার আহ্বান জানান।
তিনি দাবি করেন, গত ২০ দিনে ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনকভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিত মৃত্যু ১৬ জন। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী গত দুই সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ৬১ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শুধু হাম নয়, দেশে ১০ ধরনের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান এই সংসদ সদস্য।
রুমিন ফারহানার নোটিশের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ভ্যাকসিনের ঘাটতি ছিল ঠিকই, তবে সরকার তা সামাল দিয়েছে। মজুত এখন ‘স্থিতিশীল’ এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, এডিবির অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে নতুন টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সারা দেশে কর্মসূচি চালু করা হবে।
তিনি আরো বলেন, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে কর্মীসংকট থাকলেও মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে। সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকেও যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাকে হামের হটস্পট বলার বিষয়ে কিছুটা দ্বিমত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তালিকায় পুরো ঢাকা শহর নয়, ১৮ জেলার কিছু কিছু উপজেলা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, যশোর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার নবাবগঞ্জ রয়েছে।
সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং আগের সময়ের ব্যর্থতায় সম্প্রতি ভ্যাকসিনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি এই সংসদকে আশ্বস্ত করছি যে ভ্যাকসিনের মজুত এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল থেকে মাল্টিডোজ ভায়ালে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সংরক্ষণ সহজ হয়। সরকারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোভিডকালীন এডিবির মহামারি তহবিলের অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকা কেনার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। সংসদে টিকা বিতরণের হিসাবও দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোতে সর্বশেষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি ভায়ালে ১০ ডোজ করে রয়েছে। আর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য গ্যাভির মাধ্যমে সরকার প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।



