হৃদ্রোগের চিকিৎসায় সক্ষমতা বাড়ছে, ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমাচ্ছে বগুড়া

একসময় উত্তরাঞ্চলের কোনো মানুষের হৃদ্রোগ ধরা পড়লেই চিকিৎসার জন্য ছুটতে হতো ঢাকায়। বিশেষায়িত পরীক্ষা, হৃদ্যন্ত্রে রিং পরানো, পেসমেকার বসানো কিংবা জটিল অস্ত্রোপচার—এসব চিকিৎসার জন্য রাজধানীকেই শেষ ভরসা মনে করা হতো। এতে একদিকে যেমন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ত, অন্যদিকে দীর্ঘ যাত্রার ধকলও সামলাতে হতো গুরুতর অসুস্থ মানুষকে।
তবে সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শহর বগুড়ায় এখন হৃদ্রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার আধুনিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে নিবিড় পরিচর্যা, ক্যাথল্যাবের চিকিৎসা, পেসমেকার স্থাপন এমনকি জটিল হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচার—অনেক সেবাই এখন মিলছে বগুড়াতেই। ফলে হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ঢাকামুখী রোগীর চাপও কিছুটা কমছে। এই পরিবর্তনে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে টিএমএসএস হার্ট সেন্টার।
দুই দশকে বিস্তৃত হয়েছে চিকিৎসাসেবা
বগুড়া সদরের ঠেঙ্গামারা এলাকায় ২০ তলা ভবনে গড়ে ওঠা টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের বিশেষায়িত ইউনিট টিএমএসএস হার্ট সেন্টার। ২০০৫ সালে বহির্বিভাগ চালুর মাধ্যমে এখানে হৃদ্রোগের চিকিৎসাসেবার যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সেবা বিস্তৃত হয়েছে। ২০১২ সালে ১২ শয্যার সিসিইউ ও পোস্ট সিসিইউ চালুর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইনডোর সেবা। এরপর ২০২১ সালে শুরু হয় টিএমএসএস হার্ট সেন্টার প্রকল্পের কার্যক্রম। বর্তমানে এখানে রয়েছে ক্যাথল্যাব, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারির মতো বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা।
টিএমএসএস হার্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. মজিবর রহমান সেলিম জানান, তাঁর নেতৃত্বে ২০০৫ সালে বহির্বিভাগের মাধ্যমে কার্ডিওলজি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দুই দশকের ব্যবধানে সেই কার্যক্রম এখন পূর্ণাঙ্গ হৃদ্রোগ চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে ১৭৮টি কার্ডিয়াক সার্জারি হয়েছে। এসব অস্ত্রোপচারের মধ্যে বাইপাস সার্জারি ও হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভের অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল চিকিৎসা রয়েছে।
১৭৫ শয্যায় বাড়ছে রোগীর চাপ
বর্তমানে টিএমএসএস হার্ট সেন্টারে রয়েছে ১৭৫টি শয্যা। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৯৭৭ জন হৃদ্রোগী। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৯৩৬ জন।
শুধু বগুড়া শহরের মানুষ নন, আশপাশের উপজেলা এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ফলে বগুড়া ধীরে ধীরে উত্তরাঞ্চলের হৃদ্রোগ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি গোলাম রসুল খানও এই সেন্টারে হৃদ্রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, এখানকার চিকিৎসাসেবার মান ঢাকার নামী হাসপাতালের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। বরং চিকিৎসা ব্যয়ের দিক থেকেও এখানে সুবিধা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
টিএমএসএস হেলথ সেক্টরের প্রধান ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, একজন রোগীকে প্রাথমিক পরামর্শ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিবিড় পরিচর্যা, ক্যাথল্যাবের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে কার্ডিয়াক সার্জারি—সবকিছুর সুযোগ একই প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালও বড় ভরসা
বগুড়ায় হৃদ্রোগ চিকিৎসার আরেকটি বড় আশ্রয় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে সরকারি এই হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হৃদ্রোগের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা এখানে আসেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯ হাজার ৯৯৪ জন রোগী।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের হাম্মাদ আলী মণ্ডল সম্প্রতি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, চিকিৎসকেরা রোগীদের প্রতি আন্তরিক হলেও বড় সমস্যা শয্যার সংকট। অনেক সময় শয্যা না পেয়ে রোগীদের মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হয়। তাঁর মতে, হৃদ্রোগ বিভাগে শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হলে আরও বেশি মানুষ স্বল্প খরচে চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
রাজধানীর বিকল্প হয়ে উঠছে বগুড়া
হৃদ্রোগের চিকিৎসায় বগুড়ায় তৈরি হওয়া এই অবকাঠামো উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য শুধু চিকিৎসার সুযোগই বাড়াচ্ছে না, কমাচ্ছে রাজধানী ছুটে যাওয়ার প্রয়োজনও। বিশেষ করে জরুরি ও জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে নিজ অঞ্চলের কাছাকাছি উন্নত চিকিৎসা পাওয়া সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়তে থাকায় বগুড়া এখন উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে হৃদ্রোগ চিকিৎসার একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হয়ে উঠছে। ফলে দীর্ঘদিনের ঢাকামুখী চিকিৎসানির্ভরতার চিত্রও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।



