বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

বৃষ্টি হলেই কেন খিচুড়ি খেতে মন চায় ?

WhatsApp Image 2026-04-06 at 17.49.18

আকাশ মুখ ভার করলেই কেন যে আমরা হেঁশেলে ঢুকে চাল–ডাল মিলিয়ে খিচুড়ি চাপিয়ে দিই, সে এক দুর্ভেদ্য রহস্যই বটে। বাঙালির বৃষ্টিবিলাস মানেই যেন সোনালু রঙের এক থালা গরমাগরম খিচুড়ি ৷ চটজলদি খিচুড়ি চুলায় তুলে এক মগ চা নিয়ে বারান্দায় বসে বা জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা যাক এমন দিনে। কাক ভেজা হয়ে বাড়ি ফিরে চালে ডালে চাপিয়ে গোসল সেরে শুধু একটু ঘি বা আচারের তেলেই দুই প্লেট ঢ্যাল্কা বা ল্যাটকা খিচুড়ি সাবড়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। আবার এই মেঘবাদলার মৌসুমে ছুটির দিনের আলসে দুপুরে ঝুম বৃষ্টির সময়ে কষ্ট করে কাঁথামুড়ি ছাড়িয়ে উঠে খেতে বসে ইলিশ ভাজা, বেগুন ভাজা বা কড়া ঝাল দিয়ে ডিম ভাজার সঙ্গে ঝরঝরে মুগ ডাল খিচুড়ি দেখলে আনন্দাশ্রু আসা খুব অস্বাভাবিক নয় খাদ্য রসিক বাঙালির নয়নে।

এটি একই সঙ্গে যেমন পেট ভরায়, তেমনই সুস্বাদুও। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন কি— বৃষ্টির দিনেই কেন খিচুড়ি খাওয়া হয়? কোথা থেকে এল এই নিয়ম? চলুন জেনে নেওয়া যাক সে গল্প। শোনা যায়, ১২০০-১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে বাংলায় খিচুড়ির আবির্ভাব। মনসামঙ্গল কাব্যে স্বয়ং শিব যে খাবারটির আবদার পার্বতীর কাছে করেছিলেন, তা হল খিচুড়ি। এটিকে ‘গরিবের আমিষ’ বলা হলেও প্রথমদিকে ডাল ছিল উচ্চশ্রেণীর খাদ্য। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে নাকি জনপ্রিয় ছিল এই পদ। তবে জনপ্রিয় ধারণা হল, খিচুড়ি খাওয়া শুরু নাকি বাউলদের হাতে। এটি নাকি প্রধানত ছিল তাদের খাবার। এই ছন্নছাড়া মানুষ পথে-ঘাটে গান করতেন, আর দক্ষিণা হিসাবে পেতেন চাল-ডাল। তারা চাল ডাল একত্রে মিলিয়ে খুব দ্রুত ও ঝামেলা বিহীনভাবে রেঁধে ফেলতেন এবং খেতেন। পরে এই খাবারের নাম হয় খিচুড়ি। কিন্তু এটি ছিল তাদের রোজকার খাবার।

তবে ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আলাদা আলাদা করে খিচুড়ির উল্লেখ আছে। যেমন, সেলুকাস উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে চাল-ডাল মেশানো পদের কথা। আল বেরুনিও খিচুড়ির প্রসঙ্গ তুলেছেন তার লেখায়। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা খিচুড়ি বানানোর ক্ষেত্রে মুগডালের কথাও বলেছেন। চাণক্যের লেখায় চন্দ্রগুপ্তের সময়কালে এর উল্লেখ মেলে।

মোঘল আমলের আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরীতে নানা ধরনের খিচুড়ি তৈরির কথা বলেছেন। শোনা যায়, খিচুড়ির প্রতি ভালোবাসা ছিল জাহাঙ্গিরেরও। তাতে পেস্তা ও কিসমিসও নাকি মেশানো হত। আর তার নাম রাখা হয়েছিল ‘লাজিজাঁ’। শোনা যায়, ভিক্টোরিয়ান যুগে খিচুড়ি নাকি ইংল্যান্ডের হেঁসেলেও ঢুকে পড়েছিল।

বর্ষার দিনে খিচুড়ি খাওয়ার সঙ্গে নাকি রয়েছে অন্য কাহিনি। গ্রামাঞ্চলে বর্ষার সময় চারপাশ জলে ভরে যেত। জল-কাদা পেড়িয়ে দূরের বাজারে যাওয়া ছিল কষ্টকর। বাজার যেহেতু করা সম্ভব হত না, তাই ঘরে থাকা উপাদান দিয়েই, মানে চাল আর ডাল দিয়েই সহজে কিছু রেঁধে ফেলতেন গৃহিণীরা।

এর উপর বৃষ্টির কারণে উনুনে বার বার আগুন ধরানোও ছিল কষ্টকর। তাই একবার আগুন জ্বালিয়ে চাল-ডালের খিচুড়িই রান্না করতেন তারা। পরে ধীরে ধীরে এই খিচুড়িই হয়ে ওঠে অনেকের পছন্দের খাবার। তার সঙ্গে মেশানো শুরু হয় অন্যান্য জিনিস। তবে এর পিছনে অন্য একটি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে বলেও মনে করেন অনেকে।

খিচুড়ি একটি গুরুপাক খাবার। এই খাবার খেলে হজমের নানা সমস্যা হতে পারে। এর সঙ্গে ভাজাভুজি খেলে তো কথাই নেই! তাই এই খাবার গরমে খাওয়া সমস্যার হতে পারে। তাই বৃষ্টিতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় খিচুড়ি খাওয়ার চল হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। একই কারণে শীতেও এটি খাওয়া হয় বলে মনে করা হয়।

খিচুড়িবৃষ্টি