কুমিল্লায় মেডিকেল ছাত্রী অর্পিতার মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা, তদন্ত কমিটি গঠন

কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। পরিবারের অভিযোগ মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে অর্পিতা। কিন্তু পুলিশ বলছে ময়নাতদন্তের আগে কিছুই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কুমিল্লার সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন। গতকাল শুক্রবার রাত ১০টার দিকে পুলিশ ক্যাম্পাস-সংলগ্ন হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। খুলনা শহরে বড় হওয়া এক ভাই-এক বোনের মধ্যে অর্পিতা ছোট।
খুলনার সরকারি করোনেশন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অর্পিতা এরপর কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ১৮তম ব্যাচে ভর্তি হন।
অর্পিতা কলেজের এক নারী শিক্ষকের মানসিক চাপে অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ‘আত্মহত্যা’ করতে বাধ্য হয়েছেন- তার পরিবার ও সহপাঠীরা এমন দাবি করলেও পুলিশ বলছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের আগে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় শনিবার (৪ মার্চ) কলেজ কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান কলেজের সহকারী অধ্যাপক সহিদ উল্লাহ।
পুলিশ ও কলেজ সূত্র জানায়, গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে কলেজটির সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর ক্যাম্পাস সংলগ্ন মহিলা হোস্টেল থেকে অর্পিতার নিথর দেহ উদ্ধার করে কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন হাসপাতালে নেওয়ার অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন ‘ওই মেডিকেল ছাত্রীর মরদেহ ১০টার দিকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। আজ শনিবার ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নেওয়া হয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে।’
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্পিতার সহপাঠীরা বলেন, ‘প্রথম বর্ষেই কলেজের এনাটমি বিভাগের প্রধান ডা. মনিরা জহিরের রোষানলে পড়েন নওশিন। এরপর প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও এনাটমি বিষয়ে অকৃতকার্য হতে হয় তাকে। এরপর গত তিন বছরে আরও ৪ বার এনাটমির পরীক্ষা দিয়েছেন নওশিন। কিন্তু প্রত্যেকবারই পরীক্ষায় ফেইল এসেছে।’
তারা বলছেন, গত ৮ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ব্যাচের তৃতীয় প্রফের ফল প্রকাশ হয়। ২০২১-২২ সেশনের সবাই এখন পঞ্চম বর্ষে পড়ছেন। কিন্তু অর্পিতা নওশিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এখনও প্রথম প্রফ পরীক্ষাই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। জুনিয়রদের সাথে তার ক্লাস করতে হচ্ছে। এতে সে মানসিকভাবে বিপর্যপ্ত ছিল, তাই অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবেলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
অর্পিতা নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান বোনের মরদেহ নিতে কুমিল্লায় অবস্থান করছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বোনের এরকম কোনো মানসিকতা নেই যে সে আত্মহত্যা করবে। শিক্ষকের মানসিক চাপ থেকে এটা হয়তো করেছে। নওশিন বারবার এনাটমি বিভাগের মনিরা ম্যাডামের (ডা. মনিরা জহির) কথা বলত। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমার বোনকে মানসিক নিপীড়ন করেছেন তিনি। সবাইকে পাস করিয়ে দেয়, আমার বোন প্রত্যেকটা সাবজেক্ট পাস করে, কিন্তু ওই একটা সাবজেক্টে আটকে রাখে। আমি বলেছি, আমার বোনের সমস্যা কোথায় বলেন, তাও বলবে না। প্রেসার দিতে দিতে আমার বোনকে মেন্টালি নিপীড়ন যারা করেছে, তারাই এই মার্ডার করেছে। আমি ওই শিক্ষকের বিচার দাবি করছি।’
শাহরিয়ার বলেন, ‘বৃহস্পতিবারও ওর (অর্পিতা) সঙ্গে আমি কথা বলেছি। ফর্ম ফিলাপের জন্য টাকা নিয়েছে। আমাকে বলল যে, ভাই আমি তো বাড়িতে বলতে পারছি না, আব্বুর ভয়ে, এখন তুই একটু ম্যানেজ কর। আমি বললাম, ঠিক আছে, তুই তোর বন্ধুর সঙ্গে ফর্ম ফিলাপটা কর, আমি টাকা পাঠাচ্ছি। আর আজকে এরকম খবর পাব কোনোদিন কল্পনা করিনি।’
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনিরা জহির কলেজের প্রয়াত অধ্যক্ষ ডা. জহিরুল ইসলামের মেয়ে। আজ শনিবার একাধিকবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক লিটন বলেন, ‘চিকিৎসক হওয়ার আগেই আমাদের একজন ছাত্রীর নিথর দেহ আজ পরিবারের কাছে যাচ্ছে। এমন মৃত্যু আমাদের মর্মাহত করেছে। তবে কোনো শিক্ষকের অবহেলার কারণে যদি তার মৃত্যু হয়ে থাকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সিরাজুল মোস্তফা বলেন, মেডিকেল ছাত্রীর মরদেহ রাতে উদ্ধার হয়। আজ মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। কি কারণে তার মৃত্যু হয়েছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছে কিনা বিষয়টির তদন্ত চলছে।



