নারী ভোটারদের কারণেই কি জামায়াতের গতিরোধ ?

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। গত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার মূলধারার বাইরে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার জোটবদ্ধভাবে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ।মোট ভোটের প্রায় ৩১ শতাংশ পাওয়ার মাধ্যমে দলটি নিজেদের ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’ নিশ্চিত করলেও, নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের আত্মবিশ্বাস অনুযায়ী তারা সরকার গঠন করতে পারেনি।
কেন জামায়াতের এই রথযাত্রা থমকে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন নারী ভোটারদের দিকে।
সংরক্ষক বনাম অংশীদার
জামায়াতের মনস্তাত্ত্বিক ভুল নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমীর শফিকুর রহমানসহ শীর্ষ নেতারা নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘জীবন দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সম্মানজনক মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে ছিল এক চরম পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তারা বারবার বোঝাতে চেয়েছেন—নারী কেবলই একজন ‘সংরক্ষিত’ সত্তা, যার পরিচয় মূলত মা বা বোন হিসেবে। জামায়াত আমীরের সেই মন্তব্য— ‘মেয়েরা যত যোগ্যই হোক, তাদের পুরুষের পেছনেই হাঁটতে হবে’—আধুনিক বাংলাদেশের স্বাবলম্বী নারীদের আত্মমর্যাদায় সরাসরি আঘাত হেনেছে।
আজকের নারী কেবল পুরুষের দ্বারা সুরক্ষিত হওয়ার অপেক্ষায় বসে নেই; তারা নিজেরা এখন সমাজের রক্ষাকর্তা। সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীরা তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। ফলে জামায়াতের এই ‘পিতৃতান্ত্রিক সুরক্ষা’র প্রস্তাবকে নারীরা তাদের স্বায়ত্তশাসন বা ‘অটোনমি’র ওপর হুমকি হিসেবে দেখেছেন।
কর্মঘণ্টার ফাঁদ ও শ্রমিক শ্রেণির শঙ্কা
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে নারী শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করার একটি প্রস্তাব ছিল। বাইরে থেকে এটিকে নারীবান্ধব মনে হলেও, সচেতন কর্মজীবী নারীরা এর ভেতরের অন্য সমীকরণটি দ্রুত ধরে ফেলেছেন। পোশাক খাতের নারী শ্রমিক থেকে শুরু করে গৃহকর্মী—সবার মধ্যেই এই ভয় কাজ করেছে যে, কর্মঘণ্টা কমানোর অর্থ হলো পরোক্ষভাবে তাদের উপার্জনকে সীমিত করা এবং পুনরায় ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করা।

ঢাকার এক গৃহকর্মীর সেই শঙ্কা—‘দাঁড়িপাল্লা ক্ষমতায় এলে মাইয়া মানুষ আর বাইরে কাম করতে পারবে না’—ব্যক্তিগত কোনো ভয় নয় বরং এটি লাখ লাখ শ্রমজীবী নারীর সামষ্টিক উদ্বেগের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যেখানে পোশাক খাতের নারী শ্রমিকরা (মোট শ্রম শক্তির ৪৪ শতাংশ) সেখানে এই ধরণের প্রস্তাব হিতে বিপরীত হওয়াই স্বাভাবিক।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষক নায়লা কবীর তার ‘রিভার্সড রিয়েলিটিস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, নারী যখন বেতনের বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ পায়, তখন তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমূল বদলে যায়। এই অর্থনৈতিক সক্ষমতা তাকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
২০২৬-এর নির্বাচনে এই চিত্রটিই ফুটে উঠেছে। গত কয়েক নির্বাচনে যারা ভোট দিতে পারেননি, এবার তারা দলবেঁধে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। এই উপস্থিতি কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং এটি ছিল এক নীরব রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা
তুরস্কের একেপি (AKP) বা ইন্দোনেশিয়ার পিকেএস (PKS)-এর মতো ইসলামপন্থী দলগুলোও যেখানে বিপুল সংখ্যক নারীকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করে সফল হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের জামায়াত এখনো মধ্যযুগীয় ‘পিছনে হাঁটা’র তত্ত্বে আটকে আছে। তুরস্কে নারী প্রতিনিধিত্ব যেখানে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে, সেখানে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সেকেলে।
সবশেষে বলা যায়, পরিসংখ্যান দ্বারা শতভাগ প্রমাণ করা অসম্ভব যে কেবল নারীর ভোটেই জামায়াতের পরাজয় হয়েছে, তবে নির্বাচনের মাঠে নারীর বিপুল উপস্থিতি এবং তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে জামায়াতের রক্ষণশীল অবস্থান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—বাংলাদেশের নারীরা তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও কর্মসংস্থানের অধিকারকে কোনো ‘সুরক্ষা’র বিনিময়ে বিসর্জন দিতে রাজি নন। পুরুষের রক্ষাকর্তা হওয়ার দাবির চেয়ে নারীর ন্যায্য মর্যাদার স্বীকৃতিটুকুই এখন রাজনীতির আসল চাবিকাঠি।



