যে নীলকুঠি একসময় ইতিহাস গড়েছিল, আজ পড়ে আছে অবহেলায়

ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মেহেরপুর। জেলার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আছে গাংনীর ভাটপাড়া নীলকুঠি। ২৭ একর জায়গাজুড়ে ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থের বাড়িটি ১৭৭৮ সালে ক্যারল বলুম নামে এক ইংরেজ ব্যক্তি স্থাপন করেন। অত্যধিক লাভজনক হওয়ায় ১৭৯৬ সালে এখানে নীল চাষ শুরু হয়।
নীল গাছ ও পচা পানি জ্বালিয়ে তৈরি করা হতো নীল রং। এক বিঘা জমিতে প্রায় তিন কেজি নীল উৎপাদন করতে ব্যয় হতো ১২-১৪ টাকা। অথচ চাষিরা পেতেন মাত্র ৩-৪ টাকা। ভাটপাড়া নীলকুঠি কাজলা নদীর তীরে অবস্থিত। ইংরেজদের প্রমোদ ঘর ও শয়নকক্ষসংবলিত দ্বিতল ভবনটি জীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কাচারি ঘর, জেলখানা, মৃত্যুকূপ ও ঘোড়ার ঘর এখন বিলুপ্ত প্রায়। কুঠি ভবন ও কিছু নীল গাছ স্মরণ করিয়ে দেয় নীলকরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা। প্রচলিত আছে, গভীর রাতে এখানে শোনা যেত নর্তকীর নূপুরের আওয়াজ ও চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ। এসব খবরে মানুষ এখানে ছুটে আসতেন। তবে জরাজীর্ণ অবস্থা, মাদকসেবীদের আড্ডখানা আর ঝোপজঙ্গলে ভরপুর থাকায় দর্শনার্থীরা নিরাশ হয়ে ফিরে যেতেন। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী বাড়িটি সংস্কারের দাবি জানান।
জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঘুম ভাঙে জেলা প্রশাসনের। নীলকুঠির ইতিহাস সংরক্ষণে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে কুঠিবাড়িটি সংস্কার ও ডিসি ইকোপার্ক গড়ে তোলা হয়। শুরুতে দর্শনার্থীর চাপ থাকলেও গত দুই-তিন বছরের অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটি আবারও দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছে। কুঠিবাড়ি ঘিরে দোকানগুলোও এখন ক্রেতাশূন্য। স্থানীয় সংবাদকর্মী আকতারুজ্জামান বলেন, পার্কটি যখন নতুন হয় দর্শনার্থী ভরে যেত। হাজারো মানুষ ভিড় জমাতেন। শিশুরাও খেলত মনের আনন্দে। প্রশাসন থেকে পার্কটি লিজ দেওয়া আছে। সঠিকভাবে পরিচালনা না করায় জরাজীর্ণ হয় পার্কটি।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে পার্কটি আবারও সুন্দরভাবে সাজানো হবে।
সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ লেখক-গবেষক আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ইংরেজদের শোষণ আর অত্যাচারের সাক্ষী ভাটপাড়া নীলকুঠি। তবে পরিতাপের বিষয়, গত কয়েক বছরে বাড়িটি জঙ্গলে ভরে গেছে। এটি দ্রুত সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এখন চলে গেছে। নীল বিদ্রোহের ইতিহাস এখন পঠিত বিষয়। তবে ভাটপাড়া নীলকুঠি বাড়িটি এখন ইতিহাসের অংশ। তাই সবার দাবি–এটি সংরক্ষণ ও সংস্কার করে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা।



