বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

জসীমউদ্দীন ও তাঁর ‘আসমানী’ কবিতা

জসীমউদ্দীন ও তাঁর ‘আসমানী’ কবিতা

কবি জসীমউদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে তাঁর মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে।

জসীমউদ্দীনের ছদ্মনাম তুজম্বর আলী। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন মোল্লা।

গ্রামীণ জীবন এবং পরিবেশ-প্রকৃতি ফুটিয়ে তোলার বিশেষ সুখ্যাতি তাঁকে ‘পল্লিকবি’র উপাধি এনে দিয়েছে।

জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বাংলাভাষার গীতিময় কবিতার উৎকৃষ্টতম নিদর্শনগুলোর অন্যতম। তাঁর কবিতা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর লেখা অসংখ্য পল্লিগীতি এখনো গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। যেমনÑ‘আমার হার কালা করলাম রে’, ‘আমায় ভাসাইলি রে’, ‘বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে’ ইত্যাদি। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় পল্লিসংগীতের সংগ্রাহক হিসেবে।

নিজের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল এই রকম :

‘দেশের অর্ধ শিক্ষিত আর শিক্ষিত সমাজ আমার পাঠক-পাঠিকা। তাহাদের কাছে আমি গ্রামবাসীদের সুখ-দুঃখ ও শোষণ-পীড়নের কাহিনি বলিয়া শিক্ষিত সমাজের মধ্যে তাহাদের প্রতি সহানুভ‚তি জাগাইতে চেষ্টা করি। আর চাই, যারা দেশের এই অগণিত জনগণকে তাহাদের সহজ-সরল জীবনের সুযোগ লইয়া তাহাদিগকে দারিদ্রে‍্যর নির্বাসনে ফেলিয়া রাখে, তাহাদের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষিত সমাজের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাইতে।’

বাংলার বিখ্যাত লোকসংগীতের গায়ক আব্বাসউদ্দীন, তাঁর সহযোগিতায় কিছু অবিস্মরণীয় লোকগীতি নির্মাণ করেছেন, বিশেষত ভাটিয়ালী ধারার। জসীমউদ্দীন রেডিওর জন্যেও আধুনিক গান লিখেছেন। তিনি তাঁর প্রতিবেশী, কবি গোলাম মোস্তফার দ্বারা ইসলামি সংগীত লিখতেও প্রভাবিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে তিনি বহু দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন।

তাঁর ‘আসমানী’ কবিতা পড়ে নাই কিংবা শোনে নাই এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশে ভার। জরাজীর্ণ জীবনকে শব্দে আবদ্ধ করে ছন্দময় গতিতে মানুষের অন্তরে পৌঁছে দিতে পূর্ণ সক্ষম কবি জসীমউদ্দীন। ‘আসমানী’ কবিতাটি মোট ৩৫ লাইন। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে তাঁর ‘এক পয়সার বাঁশি’ কাব্যগ্রšে’। পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক স্কুলের পাঠ্যসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলÑ

আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,

রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।

বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,

একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।

একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,

তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।

পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,

সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।

মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি

থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।

পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,

সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।

ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,

সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রæ রাশি রাশি।

বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হলো তাই কেঁদে,

হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।

আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে

ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।

ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,

সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।

পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,

বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।

কবিতার একটি চরিত্র থেকেই ফরিদপুরের রসুলপুর গ্রামের অতি সাধারণ এই আসমানী বেগম সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলেন পরিচিত। কবিতায় বর্ণনা পাওয়া হতদরিদ্র আসমানী যে বাস্তবেরই এক চরিত্র, তার সন্ধান মেলে কবিতাটি লেখার অনেক বছর পর।

আসমানী বেগমের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কন্যা আলেয়া বেগম বলছিলেন, ‘আমার মা তখন অনেক ছোট, নয় যখন বয়স, তখন জসীমউদ্দীন আমাদের গ্রামে আসেন। তবে অনেক পরে আমরা জানতে পারি, জসীমউদ্দীন আমার মাকে নিয়েই এই কবিতা লিখেছেন।’

কবি জসীমউদ্দীনের ভাই সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদের শ্বশুরবাড়ি ছিল আজকের ফরিদপুর সদরের ইষান গোপালপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে। সেখানে একবার বেড়াতে গিয়ে এই আসমানীর দেখা পান তিনি।

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের মফিজ ইমাম মিলন জানান, জসীমউদ্দীনের ‘জীবন কথা’ বইয়ের প্রথম সংস্করণে এই তথ্যটি ছিল। ফরিদপুরের একজন জেলাপ্রশাসক জালাল আহমদে উদ্যোগ নিয়ে এই আসমানীকে খুঁজে বের করেন।

আসমানী বেগম মারা যান ১৮ আগস্ট, ২০১২ সালে।

‘আসমানী’ কবিতাটি মূলত গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র‍্য, শোষণ ও অবহেলাকে তুলে ধরে, যা একদিকে পাঠককে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে এবং অপরদিকে তৎকালীন সমাজব্যব¯’ার প্রতি একধরনের প্রতিবাদী সুর বহন করে। তাই এ কবিতার বাস্তববাদী চিত্রায়ণ, সামাজিক অঙ্গীকার, ছন্দ-মাধুর্য এবং চরিত্র-নির্মাণ নিয়ে আলোচনা করা হয়, যা আজও প্রাসঙ্গিক ও প্রশংসিত।

আসমানী নামক এক দরিদ্র মেয়ে, যা গ্রামীণ সমাজের হাজারো অসহায় মানুষের প্রতিনিধি। ‘আসমানী’ চরিত্রটি কালজয়ী, কারণ দেশভাগের পরেও এই ধরনের আসমানীরা সমাজে বিদ্যমান। পল্লিকবির নিজস্ব ঢঙের সরল, সাবলীল ও শ্রæতিমধুর ভাষা এবং ছন্দের ব্যবহার পাঠককে আকৃষ্ট করে। কবিতাটি মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এর বিষয়ব¯‘ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং কিছু সময়ের জন্য এটি পাঠ্যসূচি থেকে বাদ গেলেও পরে বিতর্কের মুখে পুনরায় ফিরে আসে।

‘আসমানী’ কবিতাটি তার সরলতা, গভীরতা এবং সামাজিক প্রতি”ছবির জন্য সমালোচকদের ও পাঠকদের কাছে সমাদৃত, এবং এর সমালোচনা মূলত এই দিকগুলোকেই বিশ্লেষণ করে।

‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি’Ñকী করুণ অব¯’া একজন আসমানী তথা সেই সমাজের। ‘একটুখানি হওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে/ তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’ এইভাবে প্রত্যেক চরণ থেকে বাস্তবতার রূপ ফুটে উঠেছে। ‘আসমানী’ চরিত্রটি হাজারো ভ‚মিহীন, গৃহহীন ও অনাহারী মানুষের প্রতি”ছবি, যা পাঠককে তাদের প্রতি সহানুভ‚তিশীল হতে এবং সমাজের বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।

কবিতাটি আসমানীর ভাঙা ঘর, ছেঁড়া কাপড়, অনাহার ও অস্বা¯’্যকর জীবনযাত্রার বর্ণনা দেয়, যা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। কবি আসমানীর কষ্টের মাধ্যমে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি গভীর মমতা ও সহানুভ‚তি প্রকাশ করেছেন এবং তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। ‘আসমানী’ কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, বরং ফরিদপুরের একজন হতদরিদ্র মেয়ে, যার জীবন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। কবিতাটি ধনী-গরিবের বৈষম্য ও বঞ্চিত শ্রেণির প্রতি সমাজের উদাসীনতাকে ইঙ্গিত করে, যেখানে আসমানীর মতো শিশুরা প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কবিতাটি পল্লিকবির এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি যা আসমানীর মতো অসংখ্য মানুষের জীবনকে চির¯’ায়ী করে রেখেছে। ‘আসমানী’ কবিতাটি পল্লিবাংলার দুঃখী মানুষের জীবন, তাদের কষ্ট ও প্রতিক‚লতার এক মর্মস্পর্শী আখ্যান, যা পাঠককে মানবিক হতে ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে উদ্বুদ্ধ করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জীবন ও সমাজের পরিবর্তন হয়েছে, তাই কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন যে কবিতাটি এখনো প্রাসঙ্গিক কি না; তবে বেশির ভাগের মতে, এর মূল বার্তা আজও বিদ্যমান। বাস্তব চরিত্র আসমানীর মৃত্যুর পর কবিতাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং মিডিয়া এটিকে নিয়ে যথেষ্ট প্রচার চালায়, যা কবিতার চরিত্রকে পরিচিত করে তোলে।

সাহিত্য-সংস্কৃতি