২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বিনোদন

বস্তিতে বেড়ে ওঠা মেয়েটি আজ দুই বাড়ির মালিক, ‘মুসাফির ক্যাফে’ অভিনেত্রীর সংগ্রামের গল্প

বস্তিতে বেড়ে ওঠা মেয়েটি আজ দুই বাড়ির মালিক, ‘মুসাফির ক্যাফে’ অভিনেত্রীর সংগ্রামের গল্প

সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন তরুণ অভিনেত্রী—মহিমা মাকওয়ানা। কিন্তু অনেকেই জানেন না তার কঠিন শৈশবের কথা। আজ ৫ আগস্ট অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে চলুন জেনে নিই তার সম্পর্কে জানা-অজানা কিছু তথ্য। তার কাছে অভিনয় কোনো শৈশবের স্বপ্ন ছিল না, বরং ছিল পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।

জন্মের কয়েক মাস পরই বাবাকে হারান মহিমা। বাবার স্মৃতি বলতে তার নিজের কিছুই নেই। পরিবারে উপার্জনের দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও সেই আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের একটি ছোট্ট চাওলে (ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন) মা ও ভাইকে নিয়ে বড় হতে থাকেন মহিমা।

মহিমার মা একসময় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও মেয়ের মধ্যে তিনি সম্ভাবনা খুঁজে পান। ৯ বছর বয়সে মহিমাকে অডিশনে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু ছোট্ট মহিমার কাছে অভিনয় আনন্দের বিষয় ছিল না বরং স্কুল শেষে বাসে করে এক অডিশন থেকে আরেক অডিশনে ছুটে বেড়ানো ছিল ক্লান্তিকর এক রুটিন।

বন্ধুরা যখন খেলাধুলা করত বা স্কুলজীবন উপভোগ করত, তখন মহিমার দিন কাটত শুটিং ফ্লোরে। নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগও ছিল না। অনেক সময় শুধু পরীক্ষার দিনই স্কুলে উপস্থিত হতে পারতেন।

পরে এক সাক্ষাৎকারে মহিমা বলেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে উপার্জনের অন্য কোনো পথ ছিল না। অভিনয় তার কাছে পেশা হওয়ার আগেই দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।

শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করার সময় মহিমা নানা ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু একটি ঘটনা তার জীবন বদলে দেয়। একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের সেটে অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সামনে সংলাপ বলতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েন তিনি। দৃশ্যটি ঠিকভাবে করতে না পারায় পরিচালকের কঠোর মন্তব্য তাকে ভীষণভাবে আঘাত করে। সেই অপমানে তিনি ভেঙে পড়েননি বরং বাড়ি ফিরে আরও বেশি অনুশীলন শুরু করেন।
মহিমা পরে বলেছেন, সেই ঘটনাই তাকে বুঝিয়েছিল—এই পেশায় টিকে থাকতে হলে প্রতিভার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমেরও বিকল্প নেই।

Advertisements

টেলিভিশনে বড় সুযোগ আসে কিশোরী বয়সে। একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের সাফল্য তার পরিবারের আর্থিক অবস্থাই বদলে দেয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মুম্বাইয়ের মীরা রোড এলাকায় পরিবারের জন্য প্রথম বাড়ি কেনেন। একই সময়ে কেনেন নিজের প্রথম গাড়িও। যে পরিবার একসময় ভাড়াবাড়িতে থাকত, তাদের জন্য এটি ছিল এক স্বপ্নপূরণ।

মহিমার ভাষায়, তার মায়ের একটাই ইচ্ছা ছিল—নিজেদের একটি বাড়ি হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করাই হয়ে উঠেছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

ছোট পর্দায় জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও নতুন লড়াই শুরু হয়। সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। বহু অডিশন দিয়েও ব্যর্থ হতে হয়েছে। কখনো কোনো প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, কখনো শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকে নেওয়া হয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি সমস্যা—‘টেলিভিশনের অভিনেত্রী’ তকমা। বহু নির্মাতার চোখে তিনি শুধু ছোট পর্দার মুখ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সেই ধারণা বদলাতে তাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ধীরে ধীরে সিনেমায় সুযোগ আসতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র ও ওটিটি সিরিজে কাজ করে নিজের পরিসর বাড়ান মহিমা। সাম্প্রতিক সময়ে ‘মুসাফির ক্যাফে’-তে তার অভিনয়ও দর্শক ও সমালোচকদের নজর কেড়েছে।

সম্প্রতি মহিমা মুম্বাইয়ে আরও বড় একটি বাড়ি কিনেছেন, যেখানে মায়ের সঙ্গে থাকেন। নিজের পছন্দমতো সাজানো সেই বাড়ি তার দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক।
তবু একটি অভাব আজও মহিমাকে তাড়া করে। বাবাকে কখনো দেখার সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট। তিনি বলেছেন, বন্ধুদের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক দেখলে তার মনে হয়, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি তিনি কখনোই জানতে পারেননি।

Advertisements