পাহাড়ি নারীদের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার ‘পিনন-হাদি’

বৈচিত্র্যময় পাহাড়ে বসবাসকারী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘পিনন-হাদি’। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীদের এই পোশাক এখন শুধু সংস্কৃতির পরিচয় নয়, বরং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে পাহাড়ি নারীদের জীবনে স্বচ্ছলতা এনে দিচ্ছে।
স্কার্টের মতো কোমরে পেঁচিয়ে পরা অংশকে বলা হয় ‘পিনন’ এবং ওড়নার মতো উপরের অংশটি ‘হাদি’। এই পোশাকগুলো বংশপরম্পরায় নারীরা ‘কোমর তাঁত’ বা ব্যাকস্ট্র্যাপ লুমে নিজের হাতে বুনে থাকেন। সুতা কাটা থেকে শুরু করে নকশা ও বুননের পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন করেন পাহাড়ি নারীরা।
পাহাড়ি সমাজে বিয়ের আগে মেয়েদের পিনন-হাদি বোনার দক্ষতা অর্জন করাকে ঐতিহ্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। যদিও বর্তমানে অনেক নারী এটি পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন, তবু নিখুঁত ও ঐতিহ্যবাহী পিনন-হাদি তৈরি এখনো সাংস্কৃতিক গর্বের অংশ।
বিজু, বৈসু ও সাংগ্রাই উৎসবসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পিনন-হাদির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। আধুনিক নকশা ও রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এসব পোশাকের চাহিদা এখন পাহাড় পেরিয়ে সমতল অঞ্চল ও বিদেশেও বাড়ছে। রাঙামাটি শহরের বনরূপা বাজারে সপ্তাহে দুই দিন শনিবার ও বুধবার হাট বসে। এসব হাটে পাহাড়ি নারী উদ্যোক্তারা পিনন-হাদি ও থামি বিক্রি করেন। হাটের দিনগুলোতে ভোর থেকেই বনরূপা ও সমতাঘাট এলাকায় রেশমি সুতায় বোনা নানা রঙের পিনন-হাদির পসরা সাজিয়ে বসেন তারা। প্রতি হাটে কয়েক লাখ টাকার বস্ত্র বিক্রি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
কাপড়ের মান, সুতার ধরন ও নকশার ওপর ভিত্তি করে পিনন-হাদির দামে ভিন্নতা দেখা যায়। সাধারণ পিনন-হাদির দাম ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। আকর্ষণীয় নকশার পিনন-হাদি ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। বিয়ে ও বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি পোশাকের দাম ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে।
রাঙামাটির রাঙাপানি এলাকার কারিগর মনিকা চাকমা বলেন, ‘কোমর তাঁতে রেশমি সুতায় হাতে বোনা এসব কাপড়ে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। সুতার দাম বেশি হওয়ায় মজুরি হিসাব করেই দাম নির্ধারণ করতে হয়।’
বিক্রেতা চিচিকো চাকমা জানান, আগে তারা শুধু নিজেদের ব্যবহারের জন্য কাপড় তৈরি করতেন। এখন ফেসবুক, পর্যটক এবং সাপ্তাহিক হাটের মাধ্যমে নিয়মিত অর্ডার পাচ্ছেন। এই আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাঙামাটি ছাড়াও এসব হাতে বোনা পিনন-হাদি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রেও এসব পোশাকের আলাদা দোকান রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা স্মারক হিসেবে পিনন-হাদি ও থামি কিনে থাকেন।
তবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নারীরা সুতার উচ্চমূল্য, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও সঠিক বিপণন ব্যবস্থার সংকটের কথা জানান। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় তারা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) রাঙামাটি জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, বিসিক থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এই শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।



