২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

নারীর স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতায় আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব

b5830d8dfab0ae69e149588f5f04c2c9-650eaacdd60a2

জন্মনিয়ন্ত্রণকে শুধু সন্তান নেওয়ার সময় বা সংখ্যা নির্ধারণের একটি উপায় হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। একজন নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের সঙ্গেও জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। কখন সন্তান নেবেন, সন্তানদের মধ্যে কতটা সময়ের ব্যবধান থাকবে কিংবা আদৌ সন্তান নেওয়া হবে কি না—এসব সিদ্ধান্তে নারীর মতামত ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংকোচ ও ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে নানা ধরনের ভ্রান্ত তথ্য প্রচলিত। অনেক নারী মনে করেন, নিয়মিত পিল বা অন্য কোনো গর্ভনিরোধক ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে সন্তান ধারণের সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যের বদলে এ ধরনের ভুল ধারণা অনেক সময় পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো। অনেক পরিবারে কতজন সন্তান হবে বা কখন সন্তান নেওয়া হবে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নারীর মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায় না। আবার প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেক নারী নিজের জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, সেটিও বুঝে উঠতে পারেন না। তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিকল্পিতভাবে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান ধারণের মধ্যে উপযুক্ত বিরতি থাকলে গর্ভধারণ ও প্রসবের ধকল সামলে শরীরকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে মাতৃত্বকালীন বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়াও সহজ হয়।

বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সহজলভ্য গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নারীদের শুধু স্বাস্থ্যগত সুরক্ষাই দেয় না, বরং শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ায়।

প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতেও নতুন বিকল্প যুক্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্ব-প্রয়োগযোগ্য বা ‘সেলফ-ইনজেকটেবল’ গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন নিয়ম মেনে পিল খেতে পারেন না, তাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর নেওয়া ইনজেকশন একটি বিকল্প হতে পারে।

Advertisements

দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকা ইনজেকশন ব্যবস্থার একটি সুবিধা হলো প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। কর্মব্যস্ত নারী কিংবা নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের কথা মনে রাখতে সমস্যায় পড়েন—এমন নারীদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। তবে কোন পদ্ধতি কার জন্য উপযুক্ত, তা নির্ধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক ইনজেকশন পদ্ধতির মধ্যে ইউনিজেক্ট ডিভাইসে ব্যবহৃত ‘ডিএমপিএ ১০৪ মি.গ্রা./মি.লি.’-এর মতো সাবকিউটেনিয়াস বা ত্বকের নিচে প্রয়োগযোগ্য ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ধরনের ইনজেকশন ত্বকের নিচে প্রয়োগ করা হয় এবং সেখান থেকে ওষুধ ধীরে ধীরে শরীরে শোষিত হয়। প্রচলিত মাংসপেশিতে প্রয়োগ করা ডিএমপিএ ইনজেকশন সাধারণত প্রায় ১৩ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ত্বকের নিচে প্রয়োগযোগ্য নতুন পদ্ধতিটি প্রায় ১৪ সপ্তাহ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ব্যবহারের নিয়ম ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শুরু না করে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে কর্মজীবী নারীদের জীবনযাত্রায় সময়ের চাপও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অফিসের দায়িত্ব, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে রাখা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। একইভাবে বারবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনও কারও জন্য অসুবিধার কারণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বা নির্দিষ্ট বিরতিতে ব্যবহারযোগ্য গর্ভনিরোধক পদ্ধতি কিছু নারীর জন্য সুবিধাজনক বিকল্প হতে পারে।

জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তাই শুধু পদ্ধতি সহজলভ্য করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সঠিক তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। কোনো গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহারের আগে এর কার্যকারিতা, উপকারিতা, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা দরকার।

নারীর প্রজননস্বাস্থ্যকে নিরাপদ রাখতে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা দূর করার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য সহজলভ্য করা জরুরি। নিজের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নারীর অধিকার। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগকে আরও বাস্তব ও কার্যকর করে তুলতে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

Advertisements