বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা কুসংস্কার নাকি বাস্তব সতর্কতা?

9-SM892755

ছোটবেলা থেকে আমরা কত কথাই না শুনে বড় হই। রাতে নখ কাটবে না, পেঁচা ডাকলে অমঙ্গল আর ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা একদম নিষেধ। বিশেষ করে ভাঙা আয়না নিয়ে ভয়টা বেশ গভীর। অনেকেই বলেন এতে অমঙ্গল হয়, ভাগ্য নষ্ট হয় কিংবা খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সত্যিই কি ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা এতটাই ভয়ংকর? নাকি এটি কেবল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি বিশ্বাস?

এই বিশ্বাসের শিকড় বেশ পুরোনো। প্রাচীনকালে মানুষ আয়নাকে শুধু প্রতিফলনের বস্তু হিসেবে দেখত না বরং আত্মার সঙ্গে যুক্ত করে ভাবত। ধারণা ছিল আয়নায় মানুষের আত্মার ছায়া পড়ে। তাই আয়না ভেঙে গেলে আত্মার ক্ষতি হয়। এমন ভাবনা থেকে ভয় জন্ম নেয়। ইউরোপের কিছু দেশে আবার বিশ্বাস ছিল যে ভাঙা আয়না মানে সাত বছরের দুর্ভাগ্য। এসব গল্প আর বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়তে পড়তে আমাদের সমাজেও জায়গা করে নিয়েছে। ফলে আজও অনেক ঘরে শোনা যায় ‘ভাঙা আয়নায় মুখ দেখিস না।’

কিন্তু বাস্তবতার আলোয় বিষয়টা দেখলে চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভাঙা আয়নায় মুখ দেখলে কোনো অশুভ শক্তি কাজ করে। এর কোনো প্রমাণ নেই। আয়না ভাঙা মানে মূলত কাচ ভাঙা। আর ভাঙা কাচ যে বিপজ্জনক, সেটাই আসল সত্য।

ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়ালে হাতে বা মুখে কাচের ধার লাগতে পারে। চোখে কাচ ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এমনকি সামান্য অসাবধানতায় গুরুতর দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এই বাস্তব ঝুঁকিগুলো থেকেই হয়তো মানুষ সাবধান হতে শুরু করেছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সাবধানতাই রূপ নিয়েছে কুসংস্কারে।

মানুষ ভয় পায় আরেকটি কারণেও। আমাদের মন সহজেই ঘটনার সঙ্গে ঘটনা জুড়ে দেয়। ধরুন কেউ ভাঙা আয়নায় মুখ দেখার পর কোনো দুর্ঘটনায় পড়ল। তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই বলি, ‘এই তো, ভাঙা আয়নার ফল।’ অথচ আমরা ভুলে যাই এর আগে বা পরে কত মানুষ ভাঙা আয়নায় মুখ দেখেও দিব্যি ভালো আছে। এই বাছাই করা উদাহরণ আর গল্পই বিশ্বাসকে আরও শক্ত করে।

আরেকটি বিষয় হলো মানসিক অস্বস্তি। ভাঙা আয়নায় নিজের মুখ অনেক সময় বিকৃত, টুকরো টুকরো লাগে। এতে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। নিজের চেহারা নিয়ে নেতিবাচক ভাব আসতে পারে। এই অস্বস্তিও মানুষকে ভাঙা আয়না এড়িয়ে চলতে শেখায়। তবে এটাকে অমঙ্গল বলা যায় না। এটা নিছক অনুভূতির ব্যাপার।

তাহলে করণীয় কী?

ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা উচিত নয় এই কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু কারণটা অমঙ্গল বা ভাগ্য নয় বরং নিরাপত্তা। ভাঙা আয়না যত দ্রুত সম্ভব মোটা কাগজ বা কাপড়ে মুড়িয়ে নিরাপদভাবে ফেলে দেওয়া উচিত। এরপর নতুন আয়না ব্যবহার করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

ভয় নয় সচেতন সিদ্ধান্তই হোক আমাদের পথচলা। বিশ্বাস আর বাস্তবতার পার্থক্য বুঝতে পারলেই অযথা ভয় থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।