অ/গ্নিকাণ্ডে সব হারিয়ে শিক্ষাজীবনে অনিশ্চয়তা আয়েশাদের

আয়েশা ক্লাস সেভেনে পড়ে, শিমু ও তাহমিনা সিক্সে। মোহনা, জান্নাত, রাবেয়া—এরা সবাই কড়াইল বস্তির জামাইবাজারের আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন হাইস্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের বার্ষিক পরীক্ষা চলতি মাসের ৭ তারিখে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। কারণ তাদের কারো কোনো বই খাতা নেই, সবই পুড়ে গেছে গত ২৫ নভেম্বরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। শুধু বই-খাতা নয়, সবই পুড়েছে তাদের।
তারা জানায়, কিছুই তারা নিতে পারেনি। শুধু জামা গায়ে জীবন বাঁচিয়েছে। ২০০-এরও বেশি পোড়াঘরের বাসিন্দারা এখন খোলা আকাশের নিচে তেরপাল টানিয়ে শিশুদের নিয়ে থাকছেন। দিনে শীত কম থাকলেও রাতে বাড়ে। সাত মাস থেকে এক বছর বয়সি বেশকিছু শিশুর নাক দিয়ে পানি পড়তে দেখা গেল। ঠান্ডা লেগেছে কি না, প্রশ্ন করলে মায়েরা আক্ষেপ করে বলেন—‘লাগছেই তো, আর কী করুম।’
জ্বলে না চুলা
গতকাল বুধবার কড়াইল বস্তিতে গিয়ে দেখা গেল ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে নিজের ঘরের ওপরে একটু কাপড় বেঁধে, কোথাও কয়েকটা ঘর মিলে বড় শামিয়ানা টানিয়ে তার নিচে বাস করছে। বাসনকোসন, চুলো, গ্লাস, জগ কিছুই নেই। সব পুড়ে ছাই হয়েছে বলে জানান জাহানারা নামে এক গৃহবধূ। জাহানারা নিজে কিছু করে না, স্বামী রিকশা চালান। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি। মহাখালী ওয়্যারলেসের উলটোদিকে ঝিলপাড়ে নৌকাযোগে কড়াইলে গিয়ে দেখা যায়—সোমা, নিরা, মাসুদা, পারভিন নামের শিশুরা সাদা প্লাস্টিকের বক্সে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাচ্ছে।
তারা জানান, প্রতিদিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের খাবারের টোকেন দেওয়া হয়, টোকেন দিয়ে তারা মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করে। দুই বেলা খাবার পায়, কখনো তিন বেলাও পায়। গৃহবধূ সুরমা বলেন—‘সব বই পুড়ে গেছে আপা। কিছু নেওয়া তো দূরের কথা, বের হওয়ারই সময় ছিল না। ঘর পুড়ে গেছে, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। অনেক পরিবার এখনো আগুনে পোড়া জায়গাতেই অবস্থান করছে।’ ঘরগুলো কবে ঠিক করা হবে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘বাড়িওয়ালা বলেছে, ঘর উঠাবে কিন্তু সময় লাগবে।’ বেশ কয়েকটি শিশু ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল, তাদের কাছে প্রশ্ন করি—তোমাদের গরম কাপড় আছে? শিশুরা জানায় রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগে।
তাদের মায়েরা বলেন, অনেকেই কম্বল, মশারি পেলেও অনেক পরিবার এখনো কিছুই পায়নি। ছোট ছোট বাচ্চাদের সর্দিকাশি লেগেই আছে। ক্ষতিগ্রস্ত নারী সুরমা আক্তার জানান, গ্যাস নেই, পানি নেই, হাঁড়িপাতিলও অনেকের নেই। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যেটুকু দিচ্ছে তা দিয়ে কোনোমতে দিন চলছে। চাল-ডাল ঠিকমতো পাইনি। শুধু খাওয়ার স্লিপ দিয়েছে।
পরীক্ষা কবে জানা নেই তাদের
আয়েশা জানায়, আগুন লাগার সময় তারা কেউ কোচিংয়ে, কেউ ঘরের বাইরে ছিল। ফিরে এসে দেখে সব কিছু পুড়ে ছাই। শিমু জানায়, পরীক্ষার জন্য তাদের প্রস্তুতি ছিল কিন্তু বই রিভিশন দিতে পারছে না, রিভিশন না দিলে পরীক্ষা কীভাবে দেবে। তাছাড়া তাদের পড়ার অনুষঙ্গ কিছুই নেই। এলাকার মায়ের দোয়া বিদ্যা নিকেতন, গ্লেরি হাই স্কুল এবং আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুল—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মায়ের দোয়া বিদ্যা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান জানান, তাদের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে কিছু কম্বল, শুকনো খাবার পেয়েছেন। পড়াশোনার কোনো অনুষঙ্গ পাননি। তারা ১০ তারিখে বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা ভাবছেন। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি তারা পরীক্ষা দিক, আর ক্ষতিগ্রস্তরা চাইলেও পরীক্ষা দিতে পারবে।
আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুলের পরিচালক আক্তারুজ্জামান বলেন, দশম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের ৩৫০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩০ জনের সব পুড়ে গেছে আর কম্বল, মশারি ছাড়া তেমন কিছু তারা দিতে পারেননি। সাহায্যের জন্য অনেক জায়গায় যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন তারা। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
অপেক্ষা শুধু সহযোগিতার জন্য
মুক্ত কাজ করেন গুলশান আর নিকেতন এলাকায়, তার মেয়ে গ্লোরি হাইস্কুলে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেয়ের স্কুলেও আগুন লেগেছে, মেয়ে স্কুলের উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করেছে। মুক্ত জানান, এখানে সবাই সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ এলেই তাকে ত্রাণের জন্য ঘিরে ধরছে। সাহায্য বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও মারামারি হচ্ছে।
পরিবারগুলোয় নতুন সংকট
বস্তির বহু পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা আগুনের আগেই, আবার কেউ কেউ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। মেয়েরা জানায়, তাদের অনেকেই যৌন হয়রানির শিকার হয়। বখাটে ছেলেরা খারাপ কথা বলে। তাই যাদের সুযোগ আছে তারা মেয়েদের খোলা আকাশের নিচে না রেখে আশেপাশে আত্মীয়দের বাসায় রাখেন। কবে তাদের নিজেদের ঘর হবে কেউ বলতে পারে না।



