বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
নারী

অদম্য অধ্যবসায়, নিখুঁত পারফরম্যান্স, গোল্ড মেডেলিস্ট রানা তাবাসসুমের গল্প

Untitled-2

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগে ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী রানা তাবাসসুমের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলা যেন এক অনুপ্রেরণার গল্প। শুরু থেকে শেষ—সব সেমিস্টারেই নিখুঁত পারফরম্যান্স, সিজিপিএ–৪ এর মধ্যে ৪। সেই ধারাবাহিক উৎকর্ষতাই তাঁকে এনে দিয়েছে ব্র্যাকের ১৭তম সমাবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্মান—চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল। বিদায়ী ভাষণ দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলে অসাধারণ ফলের পর ব্র্যাকে ভর্তির সুযোগ পান তাবাসসুম। প্রথম সেমিস্টারে উচ্চমাধ্যমিকের ফলের ভিত্তিতে পান ফুল স্কলারশিপ। ব্র্যাকের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি সেমিস্টারের জিপিএ স্কলারশিপ নবায়নের মূল চাবিকাঠি—এবং তিনি প্রতিটি সেমিস্টারেই ধরে রাখেন নিখুঁত ৪.০০। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাই তাঁর পড়াশোনা ফুল স্কলারশিপেই শেষ হয়।

তাবাসসুম বলেন, “ব্র্যাকে ভালো করতে হলে প্রতিটি কুইজ, মিডটার্ম, ফাইনাল—সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কোনো কোর্সে ৯০ শতাংশের নিচে নামার সুযোগই নেই।” কঠোর এই নিয়মই তাঁকে প্রতিটি সেমিস্টারে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করেছে।

পরিবার ছিল তাঁর সাফল্যের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বাবার চাকরির কারণে অনেক সময়ই তিনি থাকতেন দূরে। তখন সংসারের সব দায়িত্ব সামলাতেন মা। বড় মেয়ে হিসেবে তাবাসসুমও ছিলেন মায়ের অন্যতম সহায়। তাবাসসুমের ভাষায়, “মা-ই ছিল আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।” পাশাপাশি ফার্মাসি স্কুলের শিক্ষকদের দিকনির্দেশনাও তাঁর কাছে ছিল অপরিসীম সহায়ক।

Advertisements

করোনাকালের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয় তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। অনলাইন ক্লাস, অনিশ্চয়তা, চারপাশের ভয়াবহতা—সবকিছুর মাঝেই শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছে ব্র্যাক। “সারা দেশ থেকে সবাই অনলাইনে যুক্ত হয়েছিল। শিক্ষকদের সহানুভূতি আমাদের সেই কঠিন সময়টাকে অনেক সহজ করেছে,” বলেন তিনি।

ছোটবেলায় তাঁর স্বপ্ন ছিল জীববিজ্ঞানী হওয়ার। সময়ের সঙ্গে আগ্রহ জন্মায় ওষুধের কার্যকারিতা, গবেষণা আর মানবদেহে ওষুধের ভূমিকা সম্পর্কে জানার প্রতি। সেই আকর্ষণই তাঁকে ফার্মাসির পথে নিয়ে আসে। তবে তাঁর যাত্রাটা সবসময় মসৃণ ছিল না—ক্লাস সিক্সে একবার অকৃতকার্য হওয়া তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস আর স্থিরতা। তাঁর মতে, সেই এক ব্যর্থতাই তাঁর পরের ঝড়-ঝাপটা সামলানোর শক্তি তৈরি করেছে।

বর্তমানে তাবাসসুম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

ফার্মাসিস্টদের সুযোগ-সম্ভাবনা নিয়েও তাঁর স্পষ্ট মত আছে। তিনি মনে করেন, দেশে সুযোগ বাড়লেও হাসপাতালভিত্তিক ফার্মাসিস্ট নিয়োগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন—এটি রোগীসেবায় বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

পড়াশোনার বাইরেও তিনি ছিলেন সক্রিয়—ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ফার্মা সোসাইটির (বিইউপিএস) এইচআর বিভাগে কো-ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি মেন্টরস কোচিং সেন্টারে ইংরেজি প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ানো তাঁর জন্য ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা।

ফার্মাসি নিয়ে পড়তে চাওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ—“ফার্মাসি একদিকে যেমন সম্মানজনক, অন্যদিকে তেমনি চ্যালেঞ্জিং। মুখস্থ না করে বুঝে পড়লে, আর চাপ না নিয়ে যাত্রাটাকে উপভোগ করতে পারলে—এই বিষয়টি সত্যিই অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা হয়।”

Advertisements