কেভম্যানদের ডায়েট, প্যালিও ডায়েট

আগে ছিল না যেমন ঔষধ ছিলনা তেমন অসুখ, এখন কালের বিবর্তনে নানান ঔষধ যেমন এসেছে সাথে এসেছে নানান অসুস্থতাও। স্বাস্থ্যসম্মত শরীর বা সুস্বাস্থ্য পেতে হলে নিজের পাতের দুকে তাকাতে হবে। অর্থাৎ আপনি খাবারে কি গ্রহণ করছেন তার উপর নির্ভর করছে আপনার স্বাস্থ্য। প্রায়ই কথায় বলা হয় যে, আগের দিনের মানুষের স্বাস্থ্য সবচেয়ে ভাল ছিলো তাদের সহজে অসুখও হোত না এখন যত যা সমস্যা। এর একটা কারণ তো আছে বটে। আগের মানুষের খাবারের ডায়েট আর এখনকার মানুষের ডায়েটে তো আসমান জমিনের তফাত। তাই এখন সুস্থ থাকতে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন সেই আগের দিনের মানুষের ডায়েট। প্রাচীন কালের ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে দিন দিন মানুষের কাছে সুস্বাস্থ্য অর্যনের জন্য। আসুন জেনে নি এই পাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে এবং কীভাবে একে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যসম্মত হবে তাও জেনে নি।
মানবজাতির প্রাচীন খাদ্যাভ্যাস বা এই ডায়েটকে একটি নামও দেওয়া হয়েছে তা হল প্যালিও ডায়েট। সেই প্রস্তর যুগ বা গুহামানবদের খাদ্যাভ্যাস এটি। তাই কেইভম্যান ডায়েট বা স্টোন এইজ ডায়েট নামেও জনপ্রিয় এটি। স্টোন এইজের খাদ্যাভ্যাস ছিল বেশ ব্যতিক্রম। লাখ লাখ বছর আগে, মানুষ প্রাণী শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করে জীবনযাপন করত, অর্থাৎ প্যালিওলিথিক যুগে বা স্টোন এইজে মানুষের প্রধান আহারই ছিল মাংস, মাছ, ফল, শাকপাতা, বাদাম, মূলজাতীয় খাবার। কারণ সেসময় কৃষি কাজ ও পশুপালন শুরু হয়নি, শুরু তো দূরে থাক তারা এসব বুঝতোই না তাই শস্য উৎপাদনের সুযোগই ছিল না। আবার দুগ্ধজাত খাবারের চলও সে সময় শুরু হয়নি। পরে যখন কৃষিকাজ এর সাথে তারা পরিচিত হল তারপর মানুষ ভাত, গম, যব, ভুট্টা, ডাল ও দুগ্ধজাত খাবার খেতে শুরু করে। এবং ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাস বদলাতে থাকে, যা ধাপে ধাপে এসে এখন পৌঁছেছে আজকের আধুনিক খাদ্যতালিকায়। খাদ্যাভ্যাস যেমন বদলে গেছে সাথে বদলে গেছে মানুষের শরীরেও বেড়ে গেছে নানান সমস্যা এবং কমতে শুরু করেছে আয়ুষ্কাল। তাই অসুস্থতা কমাতে ও দীর্ঘ জীবনকালের আাশায় অনেকে মানতে শুরু করেছে অতীতের নানা রকম ডায়েট। সেগুলোর মধ্যে প্যালিও ডায়েট হচ্ছে জনপ্রিয়। এটিতে বিশ্বাস করা হয় যে, আমাদের দেহ এখনো আধুনিক খাদ্যের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি। জেনেটিক গঠনে মানুষ এখনো প্রাচীন যুগের মতোই আছে। তাই প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি, পরিশোধিত তেল বা শস্য আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

তবে এই করতে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মেনে চলতে হয়। কেননা সবরকমের ডায়েটেরই রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন আছে। বিভিন্ন ডায়েটে রয়েছে ভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও রিকমেন্ডেশন। এগুলো না মানলে পড়তে হবে বিপদে। ভালো করতে গিয়ে শরীর হবে উল্টো অসুস্থ।
কেভম্যান ডায়েট কিছু খাবার সমর্থন করে, আবার কিছু খাবারে আছে নিষেধাজ্ঞাও। এই ডায়েট অনুসরণ করলে বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও শাকসবজি, বাদাম, বীজ, মাংস; বিশেষত ঘাস খাওয়া প্রাণীর মাংস, পোলট্রি, মাছ, ডিম খেতে হয়। আর অন্যদিকে শস্য; যেমন চাল, গম, যব, ভুট্টা এবং ডালজাতীয় খাবার, মিল্ক ও ডেইরি প্রোডাক্ট, যেকোনো প্রসেসড ফুড, ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড, সুগার ও লবণ এ খাদ্যতালিকায় রাখা নিষেধ।
উপকারিতা
নিয়ম অনুযায়ী ডায়েট টি করতে পারলে এর উপকারিতা রয়েছে অনেক। অনেক গবেষণার দ্বারা জানা যায়, এই ডায়েট অনেক বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। যেমনঃ
এই ডায়েটে প্রসেসড ফুড খাওয়া বারণ যার কারণে লিভারের সুস্থতা ফিরে আসতে থাকে এবং ওজন কমতেও সাহায্য করে। কেভম্যান ডায়েট রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। এ ধরনের ডায়েটে শস্য ও প্রসেসড সুগার বাদ দেওয়া হয় বলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে আসে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে উপকার মেলে। হৃদ্রোগের ঝুঁকিও কমাতে এ ডায়েট উপকারী। শুধু প্রাকৃতিক খাবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ করা হয় বলে রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই ডায়েটে যেহেতু প্রচুর আঁশযুক্ত ফল ও শাকসবজি খাওয়া হয়, তাই কোষ্ঠকাঠিন্য কমে এবং হজমতন্ত্র সুস্থ থাকে। যার ফলে অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের সমস্যা শরীর থেকে পালায়। এ ডায়েটে যেহেতু সবই ন্যাচারাল খাবার এবং এটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ডায়েট, তাই শরীর ডিটক্সিফাই করে। এতে ক্লান্তি কমে যায় এবং স্বাভাবিক এনার্জি বাড়ে।
সতর্কতা
তবে গবেষণায় এও পাওয়া গেছে যে, প্যালিও ধরনের ডায়েটের কিছু সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি। আগেই বলা হয়েছিল সব কিছু রুলস ও রেগুলেশন রয়েছে। তাই কিছু সতর্কতা বজায় রাখতে হয় এই ডায়েট করতে গেলে।
দীর্ঘদিন প্যালিও ডায়েট অনুসরণে শরীরে শরীরের শক্তি প্রদানকারি ক্ষমতা নষ্ট করতে পারে। কারণ শস্য, ডাল ও দুগ্ধজাত এগুলো এ ডায়েটে বাদ পরে।কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি আমাদের শরীরে শক্তি প্রদান, কোষ ও হাড়ের সুস্থতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। আর এগুলোর দারুণ উৎস হলো শস্য, ডাল ও দুগ্ধজাত খাবার।
আবার এটি অনান্য ডয়েটের চেয়ে ব্যায়বহুল এটি মূলত মাংস, মাছ, বাদাম ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খরচ পড়ে যায় তুলনামূলক বেশি।
শিশু, গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এ ডায়েটের অনুসরণ উপকারের বদলে ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। কারণ এই ডায়েটে ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের সামঞ্জস্য থাকে না।
এ ডায়েটের অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই সঠিক জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া হঠাৎ এ ডায়েট শুরু করবেন না, না হয় পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।



