বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
নারী

দলিত নারীর দারিদ্র্য: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার

Untitled-10

বাংলাদেশের অনেক নারীই এখন শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার বাইরে পড়ে আছে এক বড় অংশ, দলিত নারীর জীবন।

মিরপুরের রবিদাসপাড়ায় থাকেন করুণা রানী দাস। একসময় গণকটুলি কলোনিতে বড় হয়েছেন তিনি। বলেন,

“আমাদের কলোনিতে মেয়েদের জন্মই হয় বিয়ে আর সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। প্রাইমারি পেরোলেই বিয়ে দিতে হয়। আমি ২৩ বছর বয়সে বিয়ে করি, তখন কলোনির সবচেয়ে ‘বুড়ো মেয়ে’ আমি।”

Advertisements

ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক করেও করুণা আজ গৃহিণী। বিয়ের এক বছর পর সন্তান না হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির মানুষ তাকে ‘বয়স্ক’ ও ‘লেখাপড়া জানা বলে বাচ্চা হবে না’—এই অভিযোগ তুলেছিল। এখন দুই সন্তানের মা, সংসারের কাজেই দিন কাটে তার। তবু মনে মনে একটাই আক্ষেপ—

“শিক্ষার পথ পেরোতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু সেই চৌকাঠেই থেমে গেলাম।”

চিটাগং রোডের সিটি কলোনির সুমিতা রানীর গল্পও ভিন্ন নয়। তিনি বলেন, “জীবনে কোনোদিন স্কুলে যেতে পারিনি, লিখতে-পড়তেও জানি না। কিন্তু আজও খুব ইচ্ছে করে শেখার।”

বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ লাখ দলিত মানুষ বসবাস করেন, এর অর্ধেকই নারী। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যের কারণে এই নারীরা সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক স্থানে ঠাঁই পেয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পদ বা স্বাস্থ্যসেবায় তাদের সুযোগ সীমিত। পুরুষদের তুলনায় তারা বেশি নিপীড়নের শিকার, কিন্তু কণ্ঠ তুলবার জায়গাও নেই।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর শিক্ষার প্রসার সত্ত্বেও কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও বর্ণবিদ্বেষ এখনো সমাজে গভীরভাবে রয়ে গেছে। দলিত নারীরা তাই আজও আলাদা কলোনিতে বিচ্ছিন্ন জীবন কাটান। সমাজের উৎসব–পার্বণ, অধিকার কিংবা রাষ্ট্রীয় সেবা—সবকিছুই যেন তাদের নাগালের বাইরে।

দলিত নারীর দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানসিক ও সামাজিকও। নিজের আয় নেই, নিজের জীবনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বাস্থ্যসেবায়ও বৈষম্য তাদের নিত্যসঙ্গী। সরকারি হাসপাতাল বা মা–শিশু ক্লিনিক সবার জন্য হলেও, পরিবারের পুরুষদের উদাসীনতা আর চিকিৎসাকর্মীদের আচরণ অনেক সময় তাদের দরজার বাইরে ফিরিয়ে দেয়।

এই নারীরা যেন এক অদৃশ্য প্রাচীরের ভেতর বন্দি—যেখানে বঞ্চনা, অসমতা আর অবহেলা প্রতিদিনের বাস্তবতা। তবু করুণা বা সুমিতার মতো নারীরা সেই প্রাচীর ভাঙার স্বপ্ন দেখেন—একদিন নিজেদের সন্তানদের যেন এই বৈষম্যের উত্তরাধিকার না পেতে হয়।

Advertisements