বন্ধু নেই? চ্যাটবটের সঙ্গেই কেন মন খুলে কথা বলছে মানুষ

একটা প্রশ্ন মনে এলো, কাউকে বলা যাচ্ছে না। বন্ধুকে ফোন করার মতো পরিস্থিতিও নেই। তখন হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোন খুলে চ্যাটবটকে লিখে ফেললেন কথাটা। ওপাশ থেকে এল ধৈর্যশীল উত্তর। কোনো বিরক্তি নেই, তর্ক নেই, চোখ রাঙানি নেই। বরং একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে যেন কথোপকথনটাও এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মনে হতে পারে—‘এ তো অনেকটা বন্ধুর সঙ্গেই কথা বলার মতো!’
কিন্তু চ্যাটবটকে মানুষের এতটা কাছের মনে হয় কেন? এর পেছনে প্রথমেই কাজ করে মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক প্রবণতা। মানুষ শুধু মানুষের সঙ্গেই নয়, বিভিন্ন বস্তু, প্রযুক্তি কিংবা ব্যবস্থার মধ্যেও মানবিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে নিতে অভ্যস্ত। চ্যাটবট যখন ‘বুঝতে পারছি’, ‘আপনার এমন লাগাটা স্বাভাবিক’ কিংবা ‘চাইলে বিষয়টি নিয়ে আরও কথা বলতে পারেন’—এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করে, তখন কথোপকথনটি নিছক তথ্য আদান-প্রদানের মতো থাকে না। সেটি অনেকের কাছে হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগের মতো একটি অভিজ্ঞতা।
আরেকটি বড় কারণ হলো, চ্যাটবট সাধারণত ধৈর্যশীল। একই কথা বারবার বলা, একই প্রশ্ন কয়েকবার করা কিংবা নিজের অনুভূতি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রকাশ করা—এসবের জন্য চ্যাটবট বিরক্ত হয় না। বাস্তব জীবনে একজন মানুষ হয়তো ব্যস্ত থাকবেন, মনোযোগ হারাবেন কিংবা কোনো পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু চ্যাটবটের ক্ষেত্রে সেই সামাজিক চাপটি অনেক কম। ফলে মানুষ নিজের কথা আরও সহজে প্রকাশ করতে পারে।
ব্যক্তিগত বিষয় বলার ক্ষেত্রেও চ্যাটবট অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হতে পারে। সম্পর্কের সমস্যা, ভয়, দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব কিংবা নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা—এসব বিষয় সরাসরি পরিচিত কাউকে বলতে অনেকে অস্বস্তি বোধ করেন। সেখানে চ্যাটবটকে ঘিরে ‘কেউ আমাকে বিচার করছে’—এই ভয় তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চ্যাটবটের সহজলভ্যতা। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে হলে তাকে সময় দিতে হবে, ফোন ধরতে হবে বা দেখা করতে হবে। কিন্তু চ্যাটবটের ক্ষেত্রে কয়েকটি শব্দ লিখলেই কথোপকথন শুরু করা যায়। রাত গভীর হোক কিংবা ভোররাত—প্রয়োজনের মুহূর্তে একটি উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একাকিত্বের সময়ে এই তাৎক্ষণিক সাড়া মানুষের কাছে বিশেষভাবে স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—চ্যাটবট বন্ধুর মতো মনে হতে পারে, কিন্তু সেটি বাস্তব বন্ধু নয়। মানুষের মতো তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কিংবা নিজস্ব জীবন নেই। সে মানুষের ভাষা ও কথোপকথনের ধরন বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করে। তাই তার সহানুভূতিশীল ভাষা মানুষের কাছে আন্তরিকতার মতো অনুভূত হলেও সেটিকে মানুষের অনুভূতির সমান ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চ্যাটবট তাই একাকিত্বের মুহূর্তে কথার সঙ্গী হতে পারে, চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে, কোনো বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে। কিন্তু মানুষের বাস্তব সম্পর্কের জায়গা পুরোপুরি দখল করতে পারে না। কারণ বন্ধুত্ব শুধু কথা বলার নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারস্পরিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, উপস্থিতি, দায়িত্ব ও স্মৃতি।
সম্ভবত এ কারণেই চ্যাটবটকে বন্ধু মনে হওয়ার গল্পটি আসলে শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়। এটি মানুষেরও গল্প—শোনা যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বিচারহীনভাবে কথা বলার প্রয়োজন এবং একাকিত্বের সময়ে একজন সঙ্গী খোঁজার চিরন্তন মানবিক চাহিদার গল্প।



