বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬
নারী

নারীমুক্তির চেতনায় গীতিনৃত্যনাট্য ‘মানুষ হবো’

Untitled-1

খেয়ালী নাট্যগোষ্ঠীর সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বছরজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মুখর হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে আয়োজন করা হয় দুই দিনব্যাপী বিশেষ সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের প্রথম দিনটি ছিল সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এ কবীরের জন্মজয়ন্তী স্মরণে নিবেদিত এক অনন্য আয়োজন ‘কাঙালের যত কথা’—যেখানে পরিবেশিত হয় তাঁর রচিত গান, কবিতা ও নাট্যাংশ। সমাপনী দিনটি আলোকিত করে খেয়ালীর ২৪তম প্রযোজনা, নারী অধিকার ও মানবিকতার চেতনায় নির্মিত গীতিনৃত্যনাট্য ‘মানুষ হবো’

নাটকটির গ্রন্থনা ও পরিকল্পনা করেছেন শাহীন আহম্মেদ, নির্দেশনা দিয়েছেন আহসানুল হক খোকন। প্রযোজনাটি সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য, অমানবিকতা ও পশ্চাৎপদ মানসিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। কাহিনিতে উঠে এসেছে আজব নগরীর নির্মম বাস্তবতা—যেখানে নারী হয়ে জন্ম নেওয়াই এক অভিশাপ বলে বিবেচিত। সেখানকার নিয়ম অনুযায়ী মেয়েদের পড়ানো যাবে কেবল ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, আর ১২–১৩ বছর বয়সেই বিয়ে বাধ্যতামূলক।

এই অমানবিক প্রথার বলি হতে যাচ্ছিল আজব নগরীর মেয়ে সুনন্দা। বয়স বারো পেরোতেই শুরু হয় তার বিয়ের তোড়জোড়। কিন্তু পণ ও দরকষাকষির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ওঠে সে পরিবারের বোঝা, সমাজের চোখে ‘অভিশাপ’। অথচ নাটকটির মূল বার্তা—নারীই সৃষ্টির উৎস, সভ্যতার প্রথম সহযাত্রী এবং জাতির উন্নতির অগ্রদূত। মা হাওয়া থেকে শতরূপা—সভ্যতার প্রতিটি সূচনালগ্নেই নারী ছিলেন প্রথম সঙ্গী।

‘মানুষ হবো’ দেখায়, মানবজাতির অর্ধেক নারীকে শৃঙ্খল, নিরক্ষরতা ও অবমূল্যায়নের বেড়াজালে বন্দি রেখে সমাজ এগোতে পারে না। পাশাপাশি নাটকটি উন্মোচন করে আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা—পুরুষতান্ত্রিক অসভ্যতার বিস্তার। নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অসংখ্য নিয়ম থাকলেও, পুরুষকে মানুষ করার শিক্ষা নেই কোথাও। নারীর পবিত্রতা রক্ষার আইন আছে, কিন্তু পুরুষের নৈতিকতার বিধান অনুপস্থিত। তাই নাটকের এক সংলাপে তীক্ষ্ণ উচ্চারণ— “নারী তাঁর শরীর রক্ষায় যত কঠোর হয়, পুরুষ সেই সুরক্ষা ভাঙতে ততই উদগ্রীব।”

Advertisements

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নারীকে শৃঙ্খলিত করলেও পুরুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায় নেয় না—ফলে গড়ে ওঠে ক্ষমতালোভী, স্বৈরাচারী মনোভাব। ভালোবাসার জায়গায় আসে কামনা, মানবতার স্থলে ভোগবিলাসের মানসিকতা। এই অন্ধকার বাস্তবতা ভেঙে মানবিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকারই নাটকটির মূল মর্ম—“মানুষ হবো।”

গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও নাট্যরসের সমন্বয়ে নির্মিত এই গীতিনৃত্যনাট্য দর্শকদের গভীর ভাবনায় নাড়া দেয়। মানবাধিকার, নারীমুক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিকতার প্রতি নতুন করে চিন্তা করার আহ্বান জানায়।

মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন—রানু আরা, রোজিনা আক্তার, ফাহিমা আফরিন ইভা, সহিফা আহম্মেদ, মমতাজ, ইয়াংফা, মঞ্জুর মামুন লিটু, জামান আহম্মেদ মিঠু, রুহুল্লাহ কিবরিয়া রবি, ইব্রাহিম খলিল, তাফসিন ও শাহীন আহম্মেদ।

Advertisements