সময়ের নদী, স্মৃতির সেতু : বাংলাদেশের বার্ধক্য, জীবনবোধ ও আগামীর নকশা

বার্ধক্যকে বোঝা মানে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় বয়স যোগ করা নয়; বরং স্মৃতির গভীর ভাঁজে সংরক্ষিত মানুষ ও সমাজের যৌথ যাত্রাকে একই সুতোয় বেঁধে দেখা। আজকের বাংলাদেশে এই যাত্রাকে মর্যাদাপূর্ণ ও সৃজনশীল শক্তিতে রূপ দিতে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের আন্তঃপ্রজন্ম সেতুবন্ধকে তথ্যভিত্তিক ও সংস্কৃতি-সংবেদনশীলভাবে পুনর্নির্মাণ করা অত্যান্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দ্রুত নগরায়ণ, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, আর ডিজিটাল রূপান্তর এই তিন শক্তি বার্ধক্য, স্মৃতি ও জীবনবোধকে একসঙ্গে নতুন সংকট এবং নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে; বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারে যেখানে যতœ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থি’তির প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।
ভোরের কুয়াশায় গ্রামবাংলার দাওয়ায় বসে থাকা দাদির মুখে পুরনো দিনের গান যেমন নরম বাতাসের মতো গৃহস্থালির ওপর দিয়ে বয়ে যায়, ঠিক তেমনি নগরের অ্যাপার্টমেন্টে ব্যস্ত নাতির কানে সেই গান আজ পৌঁছায় হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোট হয়ে। বাস্তবিকতার গ্যারাকলে থাকা এই দুই প্রান্তের মাঝে যে অদৃশ্য সেতু দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম স্মৃতি ব্যক্তিগতও, সমষ্টিগতও। একসময় পরিবারের কেন্দ্রে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছিলেন নৈতিক কম্পাস, গল্পের ঝুলি ও পরামর্শের মূলমন্ত্র এবং অক্ষ; আজও তাঁরা আছেন, তবে কাজের ধরন, ভৌগোলিক দূরত্ব ও জীবনের তালে সম্পর্কের স্থিতি অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এই পরিবর্তনকে অবহেলা নয়, বোঝাপড়া দিয়ে বোঝার চেষ্টা না করলে আমরা বার্ধক্যকে কেবল চিকিৎসা ও পেনশনের খাতে ইতিমধ্যে আটকে ফেলেছি এবং ভবিষ্যতে পুরো বদ্ধ করে ফেলব; জীবনবোধের অনন্য সম্পদে রূপ দিতে আমরা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ হব। বাংলাদেশের জনতত্তে¡ আজ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ আলোচিত হলেও, আগামী দুই দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বেÑ যা এই বাস্তবতায় বার্ধক্যকে ব্যয় নয়, সক্ষমতা-নিবেশ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা দরকার বলে নানা নীতি-দলিল ও গবেষণা ইঙ্গিত করে (বিএসএস, ২০২২; ডবিøউএইচও, ২০২৩-এর সারসংক্ষেপ)। এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য তাই সরল কিš‘ সুদূরপ্রসারী: বার্ধক্য, স্মৃতি ও জীবনবোধকে সমন্বিত করে পরিবার, সম্প্রদায় ও রাষ্ট্র যদি অংশগ্রহণমূলক ও তথ্যভিত্তিক নকশা অতি দ্রæত গ্রহণ করে, তবে অতীতের প্রজ্ঞা বর্তমানের প্রযুক্তির সঙ্গে মিলে আগামীর মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্য-সমাজ নির্মাণে কার্যকর পথ দেখাবে বলে সুশীল সমাজ এবং আমরা মনে করি। সে উদ্দেশ্যে প্রথমে ধারণার পটভ‚মি, পরের অংশে যুক্তি ও উদাহরণ, এবং শেষে বিরুদ্ধ মতের সম্মানজনক খÐনের মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার পথরেখা উপস্থাপিত হবেÑযাতে পাঠের বৃত্তটি শুরুতে আঁকা দৃশ্যে ফিরে গিয়েও নতুন অর্থে তার সঠিক দিকনির্দেশনাটি পেয়ে উজ্জ্বলতার সঙ্গে শিহরিত হয়।
ধারণার পটভ‚মি : বার্ধক্য-স্মৃতি-জীবনবোধ
বার্ধক্য বলতে কেবল জৈবিক বয়ঃক্রমকে বোঝানো হয় না; বরঞ্চ এটি স্পষ্টভাবে বোঝায় সেই জীবনপর্বকে, যেখানে অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা, অবসাদ ও আবিষ্কার, নির্ভরতা ও নৈতিক কর্তৃত্ব পাশাপাশি খুবই দৃঢ়ভাবে সহাবস্থান করে। সেখানে স্মৃতি হয়ে ওঠে আত্মচিন্তার পাথেয় এবং সমাজের ধারাবাহিকতার একটি উজ্জ্বল মানচিহ্ন। স্মৃতি দ্বিমাত্রিকÑব্যক্তিগত স্মৃতি যেমন শৈশবের নদী, যুদ্ধের গল্প, শ্রমবাজারে টিকে থাকার টানাপোড়েন; তেমনি সমষ্টিগত স্মৃতি যেমন ভাষা আন্দোলন, জুলাই আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ঘূর্ণিঝড়ে হারানো গ্রাম ও পুনর্গঠনের সাহস, বা প্রবাসজীবনের বেদন-উত্তাপকে খুবই গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। এই স্মৃতিই জীবনবোধকে গঠন করে এবং বার্ধক্যে এসে তাকে নতুন করে মূল্যায়নের একটি উত্তম সুযোগ তৈরি করে দেয়। আমাদের এই জীবনবোধ বলতে জীবনের অর্থ সম্পর্কে ভিতরে গড়ে ওঠা সব ধরনের উপলব্ধিÑধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, আধুনিক শিক্ষার আলো, শ্রমজীবনের সঞ্চিত শিক্ষা, এবং পরিবার-সম্পর্কের নৈতিকতাÑসবই মিলিয়ে যা দাঁড়ায়। বাংলাদেশে বর্তমানে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভÑবার্ধক্য, স্মৃতি, জীবনবোধ এগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তর, নারীর আয়ের অংশগ্রহণ, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং বৈদেশিক অভিবাসনের দীর্ঘ তরঙ্গের কারণে। ফলত পুরনো সামাজিক সমর্থনের ব্যূহ একদিকে যেমন খুবই বাজেভাবে দুর্বল হয়েছে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি নতুন সহায়তা-ব্যবস্থার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই প্রবন্ধে অতীতের নৈতিক-সামাজিক পুঁজি, বর্তমানের নীতিপ্রবাহ ও প্রযুক্তির বাস্তবতা, এবং ভবিষ্যতের জনতাত্তিক প্রক্ষেপণ এই তিন লেন্সে আমরা ফুটিয়ে তুলতে যাচ্ছি যে, কীভাবে বার্ধক্য মর্যাদা পেতে পারে এবং স্মৃতি নস্টালজিয়ায় আটকে না থেকে সৃজনশীল সম্পদে এই মূল্যবান মনুষ্য জাতিকে রূপ দেওয়া যেতে পারে।
যুক্তি১ : পরিবার ও সম্প্রদায়ের বদলে যাওয়া ভ‚দৃশ্য
আমাদের প্রথম এবং অত্যন্ত মূল্যবান দাবিটি হলো বাংলাদেশের পরিবার ও সম্প্রদায়ের পরিবর্তিত কাঠামো বার্ধক্যের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে; যার ফলে স্মৃতির উত্তরাধিকার রক্ষায় পুরনো অনুশাসন যথেষ্ট নয়, দরকার অংশগ্রহণমূলক ও তথ্যভিত্তিক নতুন শক্তিশালী সেতুবন্ধন। কালের অবর্তমানে বর্তমান বাংলাদেশে যৌথ পরিবার থেকে নিউক্লিয়ার পরিবারে গমন, কর্মসংস্থানের খোঁজে শহর-বিদেশে অভিবাসন, নারীর কর্মজীবনে প্রবেশ এবং আবাসনের সংকোচন সব মিলিয়ে প্রবীণদের যত, সঙ্গ, মানসিক সুস্থতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নতুন একাধিক জটিল সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে। আগে যেমন পাড়াপড়শির নজরদারি বা আত্মীয়স্বজনের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি ধরা-বাঁধা ছিল, কিন্তু‘ দুর্ভাগ্যবশত আজ তা আর অবশ্যম্ভাবী নয়।
ধরা যাক, বরিশালের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করা এক মাকে একা রেখে দু সন্তান ঢাকায় চাকরি করছে। ফোনে প্রতিনিয়তই খোঁজ নেওয়া হয়, কিš‘ দুর্ভাগ্যবশত হঠাৎ অসুস্থর মুহূর্তে প্রতিবেশীকেই ডাকতে হয়; শৌচাগারের নিরাপত্তা, সিঁড়ি-লিফট, বাজারে যাওয়ার সক্ষমতা এসবই হয়ে ওঠে জীবনমানের অনন্য নির্ধারক। এখানে কেবল আবেগ নয়; দরকার সহজ এবং প্রতিফলন যোগ্য রূপরেখা, সহজ ও শৃঙ্খল অবকাঠামো এবং সুশীল নীতি। সরকারি বৃদ্ধভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, সিটি করপোরেশনের বয়স্কবান্ধব পার্ক-ওয়াকওয়ে, বা এনজিও নেতৃত্বাধীন হোম-কেয়ার উদ্যোগ কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু বিস্তৃিতি ও গুণমানে বৈচিত্রের কারণে সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে এটি সক্ষম হয়ে ওঠে নাÑবিভিন্ন সমীক্ষায় এই ‘কভারেজ গ্যাপ’ ইতিমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে (বিআইডিএস, ২০২৩; স্থানীয় সরকার নথি)। যার ফলে পরিবার-সমাজের রূপান্তরকে এক অভ‚তপূর্ব ‘ক্ষয়’ বলে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হয়; আর অন্যদিকে ‘রূপান্তরমান সক্ষমতা’ বলে দেখলে নকশা-পরিবর্তনের এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয় এবং এর পাশাপাশি স্মৃতির উত্তরাধিকারকেও জীবন্ত ধরে রাখা যায়।
বিগত কয়েক দশকে গ্রামীণ সমাজে মৌসুমি দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রবীণদের স্থানচ্যুতি ও জীবিকাগত চাপ বাড়িয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রবীণ কৃষকের মুখে কোন বাতাসে কোন গাছ বাঁকে, কোন জোয়ারে কেমন বাঁধ টেকেÑএসব কেবল গল্প নয়; এটি পরিবেশ-জ্ঞাননির্ভর মৌখিক মানচিত্র, যা দুর্যোগ-প্র¯‘তিতে এক অমূল্য শিক্ষা যা বাস্তবতা থেকে অর্জিত হয়েছে। কি বিদ্যালয়, উপজেলা পরিকল্পনা সভা বা দুর্যোগ প্রশিক্ষণে এই জ্ঞান ধরে রাখার সুনির্দিষ্ট পথ না থাকলে স্মৃতি প্রজন্মান্তরে ছিঁড়ে ইতিমধ্যে যা”েছ এবং ভবিষ্যতেও যাবে, আর বার্ধক্য একাকিত্বের আখ্যান হয়ে দাঁড়ায়। তাই ‘ইন্টারজেনারেশনাল মিট-আপ’, ¯স্থানীয় ইতিহাস-আর্কাইভ, প্রবীণ-নাগরিক কাউন্সিলের মতো অংশগ্রহণমূলক মডেল জরুরি যেখানে প্রবীণদের নৈতিক কর্তৃত্ব সম্মান পায় এবং তাদের কণ্ঠ নকশা-পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের উজ্জ্বল বাংলাদেশ গড়তে এবং গ্রামকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিধ্বনিত হয়। এতে স্মৃতি কেবল নস্টালজিয়া নয়, ব্যবহারিক জ্ঞান ও সামাজিক পুঁজির উৎসে পরিণত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হওয়া জরুরি।
যুক্তিÑ২: প্রযুক্তি-সমর্থিত সক্রিয় বার্ধক্য
আমাদের দ্বিতীয় দাবি হলোÑপ্রযুক্তি সমর্থিত, তথ্যভিত্তিক ও সংস্কৃতি-সংবেদনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে বার্ধক্যকে ‘সক্রিয়’ ও ‘সম্মানজনক’ পর্যায়ে টেকসই উন্নতি করা সম্ভব; সেখানে স্মৃতি হয়ে ওঠে থেরাপি, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের যৌথ প্ল্যাটফর্ম, আর জীবনবোধ নতুন অর্থে প্রসারিত হয়। ‘সক্রিয় বার্ধক্য’ ধারণার তিন স্তম্ভÑস্বাস্থ, অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা বাংলাদেশে অনুবাদের সময় স্থানীয় ভাষা, পারিবারিক অভ্যাস ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে সম্মান দিলে গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই বাড়ে। এই অনুবাদকে এগিয়ে নিতে পারে প্রাথমিক স্বাস্থব্যবস্থা জেরিয়াট্রিক স্ক্রিনিং, টেলিমেডিসিন, এবং ইউনিয়ন-পৌরসভা স্তরে ‘এজ-বন্ধু’ ডিজাইন চেকলিস্ট।
আপনারা একবার ভেবে দেখুন তো, ওয়ার্ডভিত্তিক একটি হেলথ-ড্যাশবোর্ড প্রবীণদের রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ট্র্যাক করছে; পরিবার-হোয়াটসঅ্যাপ গ্রæপে সপ্তাহে একবার স্বল্প ব্যয়নের ভিডিও যাচ্ছে ¯স্থানীয় মসজিদ-মন্দির বা কমিউনিটি সেন্টারে সপ্তাহে একদিন ‘স্মৃতি-আসর’ বসছে যেখানে নাতি-নাতনিরা তাদের পাঠ্যবিষয়ে স্থানীয় চিরন্তন সত্য ইতিহাস যা গল্পের মধ্য দিয়ে শুনবে। ছোটো এই নকশাগুলো বড়ো পরিবর্তনের বীজ বয়ে আনতে পারে এবং ভবিষ্যতে এই বীজই একটি বড়ো বটবৃক্ষের আকার ধারণ করবে। ইউনেস্কোর ‘কমিউনিটি-লার্নিং সেন্টার’ মডেলের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে (ইউনেস্কো, ২০২২) স্থানীয় সরকার এমন প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করলে স্বাস্থ্য-শিক্ষা-সংস্কৃতির ত্রিভুজে বার্ধক্য মর্যাদা ইতিমধ্যে পেয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও পাওয়ার পাশাপাশি স্মৃতি ব্যবহারিক অনুশীলনে মান আরো অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং বার্ধক্য জীবনবোধ নিয়ে কাজ করছে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বহু সংস্থা, তবে নিবন্ধিত ও বৃহত্তর পরিসরে সক্রিয় মোট সংখ্যা নিরুপণ করা বেশ কঠিন, কারণ সমাজসেবা অধিদপ্তর ছাড়াও অসংখ্য ক্ষুদ্র স্থানীয় উদ্যোগ কাজ করে। সরকারিভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ‘বয়স্কভাতা’ কর্মসূচির মাধ্যমে ৪৪ লক্ষাধিক (আগামী অর্থবছর থেকে) প্রবীণকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ (এক নামে পরিচিত), ‘রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)’, ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি)’ এবং ‘প্যারেন্টস এজিং ফাউন্ডেশন’ অন্যতম। এদের মূল উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হলো প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, সু¯’ ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করা, শারীরিক ও মানসিক স্বা¯’্যসেবা প্রদান, আর্থিক অস”ছলতা দূরীকরণ এবং সামাজিক বি”িছন্নতা কমানো।
এই সং¯’াগুলো প্রধানত স্বাস্থসেবা (ক্লিনিক, ফিজিওথেরাপি, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা), আর্থিক সহায়তা (ভাতা, ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয় স্কিম), প্রবীণ নিবাস/শান্তি নিবাস পরিচালনা, এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো সেবা চালু রেখেছে। যেমন পিকেএসএফ ১১৬টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ৬৪টি জেলায় প্রবীণ কর্মসূচি চালা”েছ। এনডিপি সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়াসহ ৬টি জেলায় কাজ করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সং¯’াগুলোর সেবা আংশিকভাবে পৌঁছালেও ‘বয়স্কভাতা’র মতো সরকারি উদ্যোগগুলোই সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়ে থাকে। সামগ্রিকভাবে, প্রবীণদের জীবনমান উন্নত করতে এই সং¯’াগুলোর প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ, তবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মতো প্রাচীন সংস্থাগুলো বিগত ৬০ বছর ধরে সেবা দিয়ে আসছে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যাগুলোর সম্মিলিত সেবাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৪০-৪৫ লক্ষের বেশি মানুষ ভাতা পাচ্ছে। মানুষ সাধারণত সংস্থার ¯স্থানীয় শাখা অফিস, স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা সামাজিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি সেবা পেতে পারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের লক্ষ্য হলো সেবার মান উন্নয়ন, উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভাতা বিতরণ নিশ্চিত করা।
একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস : ইঅঅওএগ
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (ইঅঅওএগ) পূর্বে পাকিস্তান প্রবীণ হিতৈষী সংঘÑযা ১৯৬০ সালের ১০ এপ্রিল অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আবদুল ওয়াহেদ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিলÑবার্ধক্যজনিত সমস্যা ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য-সামাজিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীলতা তৈরি করা এবং যার জন্য তিনি উদ্যোগ নেন। নিজের বাসভবনে চিকিৎসা উপকরণ ও আসবাবপত্র দিয়ে ঙচউ-সেবা, গবেষণা এবং চধশরংঃধহ ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ এবৎরধঃৎরপং ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু হয়েছিল। এরপরে এটি আগারগাঁওয়ে সরকারি জমির ওপর ইনস্টিটিউট ও প্রবীণ ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়; সরকারি অনুদানে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশালসহ বিভাগীয় শহরে প্রবীণ ক্লিনিক স্থাপনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন এবং আরো কিছু গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছেÑহাসপাতাল-ক্লিনিক-হোম-কেয়ার, একাডেমিক কোর্স ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা, জার্নাল প্রকাশন, প্রবীণনিবাস ও দিবা সেবাকেন্দ্র ইত্যাদি। ২০১৫ সাল থেকে সামাজিক সেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নীলফামারী জেলা শাখায় প্রতি শনিবার ১১টা থেকে ১টা দুইজন সরকারি চিকিৎসকের মাধ্যমে ফ্রি চিকিৎসাসেবা শুরু হয়। তবে ২০২৩ সালে আগারগাঁওয়ের মূল ইনস্টিটিউটে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম-সংকট দেখা দিলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫-২০২৭ মেয়াদের নির্বাহী কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন হয়; সামাজিক কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ শপথ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে সরকারি আর্থিক সহায়তা ও নির্বাচিত কমিটিতে প্রত্যাবর্তন প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবেÑতিনি এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ডিজিটাল সম্ভাবনা : স্মৃতি-ভান্ডার ও সিলভার ইকোনমি
আমাদের ডিজিটাল প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাবনা হলো‘স্মৃতি-ভান্ডার’ বা ডিজিটাল হেরিটেজ আর্কাইভÑযেখানে পরিবার ও পাড়া মিলে প্রবীণদের কণ্ঠ, গল্প, লোকগান, রান্নার রেসিপি, কৃষি-কৌশল, নদীপথের মানচিত্র নথিবদ্ধ করে; স্কুল-কলেজের প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষায় এগুলো পড়াশোনার অংশ হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত জার্নালিং, ফটো-থেরাপি ও পরিচিত সুর-গান মস্তিষ্কে সবসময় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে যদি কমিউনিটি-হেলথ ওয়ার্কারদের প্রশিক্ষণে এই উপাদানগুলো ঢোকানো সম্ভব হয় এবং এর পাশাপাশি পরিবারগুলো সহজ মোবাইল-অ্যাপ দিয়ে স্মৃতি সাজাতে শেখে, তবে চিকিৎসকদলকে সঠিক সময় সঠিক সহায়তা করার পাশাপাশি সেবার মান অনেকটা উন্নত হবে।
একইসঙ্গে ‘সিলভার ইকোনমি’Ñপ্রবীণবান্ধব পণ্য, সেবা ও পর্যটনের বাজার নতুন উদ্যোক্তা সুযোগকে খুলে দিতে সাহায্য করে। হাঁটার লাঠি থেকে স্মার্ট-রিমাইন্ডার, প্রতিবন্ধকতাহীন বাসাবাড়ির নকশা থেকে ‘ফল-ডিটেকশন’-সমৃদ্ধ ডিভাইস¯স্থানীয় উদ্ভাবন কর্মসংস্থান বাড়ায় এবং প্রবীণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ, ব্যবহারিক সমাধান হাজির করে। তখন প্রযুক্তি শীতল স্ক্রিন নয়; উষ্ণ সেতুÑযা পরিবারের আবেগ, সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের নীতিকে এক জায়গায় এনে একটি উন্নত জীবনবোধকে প্রসারিত করে।
বিরুদ্ধ মত ও তার খÐন
আমাদের মধ্যে অনেকেরই বিরুদ্ধ যুক্তি বলেÑবাংলাদেশে এখনো দরিদ্রতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষার গুণমান, পরিবেশ-ঝুঁকিÑএসব তীব্র অগ্রাধিকারে জায়গা করে রেখেছে; সেখানে বার্ধক্যকেন্দ্রিক বড় বিনিয়োগ বাস্তবসম্মত নয়, পরিবারের নৈতিক দায়িত্বই যথেষ্ট। সুতরাং আমরা খুব সহজেই বলতে পারি, এই যুক্তিটি আংশিক সত্য। সম্পদের প্রতিযোগিতা অনিবার্য, পরিবার এখনো পর্যন্ত প্রবীণদের যতেœর প্রধান স্তম্ভ হয়ে রয়েছে। কি‘ অন্যদিকে আমাদের বাস্তবতা হলোÑপরিবারের ভেতরের শ্রমবণ্টন অনেকটাই বদলেছে; কেয়ার-বার্ডেন অপ্রতুলভাবে সম্পূর্ণটাই নারীর কাঁধে জেঁকে বসেছে; নগর আবাসে সময়-¯’ান সংকোচন প্রবীণদের গৃহে বন্দি করছে। যার ফলে ‘পরিবারই যথেষ্ট’Ñআজ প্রায়শই নৈতিক আহŸান, নকশাগত সমাধান হয়ে উঠতে পারছে না।
অনেকেরই আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি হলোÑডিজিটাল সমাধান প্রবীণদের ‘ডিসকানেক্টেড’ করে; প্রযুক্তিকে শেখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠের অভিজ্ঞতা বলছেÑযদি টুল মাতৃভাষায়, বড় ফন্টে, অডিও-সহায়কসহ আসে এবং পরিবারের তরুণ সদস্যরা মেন্টর হয়, তবে গ্রহণযোগ্যতা অতিদ্রæত বাড়বে এবং এর সুফলও খুব তাড়াতাড়ি আসবে। এই ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে এখন প্রায় স্মার্ট ফোন অধিকাংশ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পৌঁছেছে, তাই প্রবেশাধিকারও অনেকটাই সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে ধরা যাকÑউপজেলা স্তরে জেরিয়াট্রিক-ফোকাল পয়েন্ট, সিটি-পৌরসভায় ‘এজ-বন্ধু নকশা’ গাইডলাইন, আর এনজিও-¯স্থানীয় সরকারের অংশীদারত্বে হোম-কেয়ার পাইলট এগুলোর খরচ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম, কি‘ এর সুপ্রভাব বহুগুণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় আমরা দেখতে পাই যে, পড়ে যাওয়া প্রতিরোধ বা ওষুধ সময়মতো স্মরণ করিয়ে দেওয়াÑদুটি উদ্যোগই আজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হারকে কমিয়ে এনেছে এবং পাশাপাশি ব্যয়ও অনেকাংশে সাশ্রয় করে (ডবিøউএইচও, ২০২৩-এর সারসংক্ষেপ)। তাই বিরুদ্ধ মতের সতর্কতা অনেকাংশে যৌক্তিক হলেও, সমাধান যদি ব্যয়-কার্যকারিতা ও ¯স্থানীয় অংশগ্রহণে নোঙর করা যায়, তবে বার্ধক্যকেন্দ্রিক বিনিয়োগ আসলে সামাজিক-অর্থনৈতিক ‘মাল্টিপ্লায়ার’ হিসাবে কাজ করে। এই জীবনবোধকে প্রজন্মগতভাবে আরো অনেক সমৃদ্ধ করে তোলা সম্ভব।
এই সংশ্লেষে এসে বলতেই হয়Ñঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্ব›দ্বকে প্রতিযোগিতা নয়, সহায়তায় রূপ দিতে হবে খুব দ্রæত। তার উপায় ‘আন্তঃপ্রজন্ম চুক্তি’ : পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার একত্রে মিলে প্রবীণদের কণ্ঠকে এক সুন্দর রূপরেখায় বসাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক বাজেটে প্রবীণ সভা ও স্মৃতি-আর্কাইভের বাজেট লাইন; স্কুল-কারিকুলামে ‘লোকায়ত জ্ঞান’ প্রকল্প; স্বাস্থকেন্দ্রে জেরিয়াট্রিক-স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা অতীব জরুরি। এতে করে খুব অল্প সময়েই আমরা দেখতে পাব যেস্মৃতি আর কেবল স্মরণ নয়; সমাজের সৃজনশীল সম্পদ হয়ে উঠেছে। তখন আর বার্ধক্য হবে না নীরবতা-অন্তরালে হারানো সময়; বরঞ্চ সেটি হবে সকালের রোদে উষ্ণ চা-কাপের পাশে গল্প, বিকেলের পার্কে হাঁটার তাল, রাতে ছোটোদের পড়ার টেবিলে জীবনপাঠের এক উজ্জ্বল আলো। এই রূপকগুলো নীতির কাগজে সঠিকভাবে এবং সঠিক পš’ায় টুকে দিতে পারলেই জীবনবোধ প্রতিদিনের অভ্যাসে বদলাবে এবং এর সুফল পুরো জাতি একদিন ভোগ করতে শুরু করবে।
উপসংহার : আহŸান ও কর্মপথ
আমরা এই প্রবন্ধের ভ‚মিকায় যে দাদির গান শুনেছিলাম, উপসংহারে এসে দেখি সেই সুর এখন নতুন এক অর্কেস্ট্রায় জায়গা পেয়েছেÑযেখানে পরিবারের যতœ, সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, রাষ্ট্রের নীতি ও প্রযুক্তির সহায়তায় সেই গান আর একাকী নয়; সমবেত কণ্ঠে ভবিষ্যতের দিকে অনবরত হেঁটে চলেছে এবং দ্রæততার সঙ্গে সে তার মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে। অতীতের স্মৃতি জীবনবোধকে গভীরতা দেয়, বর্তমানের নকশা মর্যাদা নিশ্চিত করে, আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা প্রবীণতাকে সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করে; ফলে বার্ধক্য সমাজের প্রান্ত নয়, মূল কেন্দ্রের স্থান পায়। আজ যদি আমরা ওয়ার্ডভিত্তিক জেরিয়াট্রিক-ড্যাশবোর্ড, কমিউনিটি-লার্নিং সেন্টারে স্মৃতি-আসর, এবং পৌর-নকশায় এজ-বন্ধু গাইডলাইন চালু করি, তবে পাঁচ বছরে পড়ে যাওয়া-জনিত আঘাত, একাকিত্ব ও ওষুধ-ভুলের হার কমানো সম্ভবÑআন্তঃপ্রজন্ম আয় সামাজিক পুঁজি পোক্ত হবে। আর যদি দ্বিধায় থাকি, তবে দ্রæত বয়স্কিকরণের চাপ পরিবারকেন্দ্রিক যতœকে ক্লান্ত করবে; নস্টালজিয়া বাস্তব সমাধানের জায়গা নেবে, যা শুধু নৈতিকভাবে বেদনাদায়কই নয়; পাশাপাশি অর্থনীতিতেও অনেকটাই ব্যয়বহুল আকার ধারণ করবে।
তাই আমাদের এই মূল্যবান আহŸানটি সংযত কিন্তু‘ স্পষ্ট প্রত্যেক পরিবার সপ্তাহে অন্তত একবার ‘স্মৃতি-আসর’ বসাক; প্রত্যেক ওয়ার্ড অফিসে একটি এজ-বন্ধু চেকলিস্ট টানানো থাকুক; প্রত্যেক স্বাস্থকেন্দ্রে একটি প্রবীণ-কাউন্টার চালু হোক। এই ছোটো ছোটো সিদ্ধান্তগুলোর যোগফলই হবে একদিন বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। সম্ভাবনার আলো ও সতর্কতার ছায়া একসঙ্গে মনে রেখে আমরা বলি বাংলাদেশ যদি নিজের ঐতিহ্যকে প্রযুক্তির সঙ্গে জুড়ে নেয়, তবে সময়ের নদীর ওপর স্মৃতির সেতু আরো মজবুত হবে এবং আগামীর নকশায় বাংলাদেশের প্রবীণতার মর্যাদা প্রাত্যহিকতায় রূপ নেবে।
আমাদের আজকের পটভ‚মির আলোচনায় স্পষ্টÑবার্ধক্য কেবল জৈবিক নয়; স্মৃতি ও জীবনবোধের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ কথোপকথন সমাজের ধারাবাহিকতা ও আত্মপরিচয়ে মূল ভ‚মিকা রাখে। যুক্তি-১-এ পরিবার ও সম্প্রদায়ের রূপান্তর কীভাবে প্রবীণতার অভিজ্ঞতা বদলে দি”েছ তা দেখানো হয়েছে; যুক্তি-২-এ প্রযুক্তি-সমর্থিত, সংস্কৃতি-সংবেদনশীল নকশার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, যা স্বাস্থ, অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তার তিন স্তম্ভে বাস্তব ফল এনে দিতে পারে। প্রতিযুক্তিকে সম্মান জানিয়ে বোঝানো হয়েছেÑসীমিত সম্পদের দেশে বার্ধক্য-বিনিয়োগ ব্যয় নয়; সঠিক নকশায় তা সাশ্রয়ী, কার্যকর ও সামাজিক-অর্থনৈতিক মাল্টিপ্লায়ার। ফলে সংশ্লেষে এসে দেখা যায়Ñঐতিহ্য ও আধুনিকতার সহাবস্থানই একমাত্র টেকসই পথ। এই জন্যই প্রবন্ধের মূল কথা এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে বার্ধক্যের অভিজ্ঞতাকে মর্যাদাপূর্ণ ও সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তর করতে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের আন্তঃপ্রজন্ম সেতুবন্ধকে তথ্যভিত্তিক ও সংস্কৃতি-সংবেদনশীলভাবে পুনর্নির্মাণ দরকার শুধু নৈতিক উ”চারণ নয়; নীতিগত নির্দেশনা ও নাগরিক অভ্যাসের যৌথ কর্মপরিকল্পনা থাকা আমাদের সকলের অতীব জরুরি এবং সেটি সঠিক সময় সঠিকভাবে পালন করাও একজন সুস্থ এবং সুশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য। সর্বোপরি আমরা এটি বলতে চাই যে একবার ভেবে দেখুন, সময়ের নদী থেমে থাকে না; স্মৃতি যদি সেতু হয়, জীবনবোধ সেই সেতুতে হাঁটার এক নির্ভরশীল ভরসা। তাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে আমরা বলতে চাই, এই সুন্দর, সুজলা বাংলাদেশের মানুষের বার্ধক্য তাই ইতিহাসের বোঝা নয়; বরঞ্চ এটি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা; আর সেই সম্ভাবনাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার এবং ভবিষ্যতেও আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।


