বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

শিশুর দুষ্টুমি নিয়ে বিরক্ত? আগে ভাবুন দায়ী কে!

6-SM1108408

“আমার সন্তান একদম কথা শোনে না, মার না খেলে কিছু শেখে না” এই কথাটি আমরা অনেক অভিভাবকের মুখেই শুনি। কিন্তু সত্যিই কি সন্তানকে মারধর করা কোনোভাবে সঠিক সমাধান?

শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল, কৌতূহলী আর খেলাধুলায় মগ্ন থাকে। তারা একবারে বড়দের মতো নিয়ম বোঝে না। অনেক সময় না পেলে চিৎকার করে, জেদ ধরে বা জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে। এসব আচরণে মা–বাবা বিরক্ত হয়ে যায়, আর রাগের মাথায় হাত তুলেও ফেলে। কিন্তু এতে কি শিশুর আচরণ বদলায়? হয়তো কয়েক মিনিট চুপ থাকে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার আগের মতোই দুষ্টুমি শুরু করে।

একবার ভেবে দেখুন, একটি নবজাতক তো জন্ম থেকেই দুষ্টু হয় না। শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক বিকাশও সময় নেয়। ছোটবেলায় সে জানে না কোনটা করা ঠিক আর কোনটা নয়। জানে না কীভাবে আবেগ প্রকাশ করতে হয় বা কিছু চাওয়ার সঠিক উপায় কী। এই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে শেখাতে হয়। ভালোবাসা, ধৈর্য আর বোঝাপড়ার মাধ্যমে।

শিশু আসলে মা বাবার আচরণ থেকেই শেখে। তাই শিশুর কোনো ভুল আচরণে যদি রাগ করে তাকে মারা হয়, তাহলে সেটি তার মনে ভয়, ক্ষোভ আর অবিশ্বাস তৈরি করে। এমনকি ভবিষ্যতে সে নিজেও রাগের সময় সহিংস আচরণ শিখে ফেলতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সন্তান লালনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ বা কোমল অভিভাবকত্ব। এখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় অভিভাবকের নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে। শিশুর ভুল আচরণের কারণ বোঝা তার আবেগকে সম্মান করা এবং শান্তভাবে সঠিক পথ শেখানোই এর মূল ভিত্তি।

একটি সহজ উদাহরণ। ধরুন, শিশু টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতল ছুড়ে ফেলেছে। পারমিসিভ অভিভাবক বলবেন, “এমন করো না প্লিজ।”  নেগলেক্টফুল অভিভাবক ভান করবেন কিছুই দেখেননি।

অথোরিটেরিয়ান অভিভাবক হয়তো চিৎকার করবেন বা শাস্তি দেবেন।  কিন্তু জেন্টল বা অথোরিটেটিভ অভিভাবক বলবেন, “তুমি হয়তো খেলতে চাও, কিন্তু বোতল ফেললে পানি শেষ হয়ে যাবে। চল, বরং বল নিয়ে খেলি।”  এই ধরনের বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুর আবেগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার সীমাও শেখানো হয়।

মনোবিজ্ঞানী ড. ব্রায়ান রাজ্জিনো বলেন, “জেন্টল প্যারেন্টিং মানে আদরে বড় করা নয়। বরং এই কৌশল শিশুকে ভবিষ্যতের জীবনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।”শিশুর প্রতি শ্রদ্ধা, সহানুভূতি আর ভালোবাসা তাকে বাবা-মায়ের ওপর আস্থা রাখতে শেখায়। সেই আস্থা থেকেই গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস, স্থিরতা ও সহানুভূতি।

তবে এই পথটা সহজ নয় বিশেষ করে যেসব বাবা-মা নিজের শৈশবে মারধর বা কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাদের জন্য আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে ধৈর্যশীল থাকা কঠিন হতে পারে। তবুও এটি শেখা সম্ভব—চেষ্টা আর সচেতনতার মাধ্যমে।

সুস্থ মানসিক বিকাশের চার ভিত্তিযুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী ড. এনি পেজালো বলেন, একটি শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য চারটি বিষয় জরুরি।  

১. নিয়ম ও কাঠামো  

২. ভালোবাসা ও উষ্ণতা  

৩. শিশুকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে দেখা  

৪. দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য ও বোঝাপড়া

শিশু কখনোই নিখুঁত মা–বাবা চায় না। সে চায় এমন অভিভাবক, যারা চেষ্টা করেন, ভুল করলে ক্ষমা চান এবং ভালোবাসা দিয়ে পথ দেখান। তাই পরেরবার যখন সন্তান দুষ্টুমি করবে, একটু থেমে ভাবুন, ও কি আসলেই ‘দুষ্ট’? নাকি শুধু আপনার মনোযোগ, সময় আর বোঝাপড়া চাইছে?