বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
নারী

ছাই থেকে নতুন ঘর: সুমুদ নামের সেই দৃঢ়তা

WhatsApp Image 2025-10-10 at 3.56.19 AM

সুমুদ কী

‘সুমুদ’ (আরবি: صمود) শব্দের অর্থ—দৃঢ়তা, অটল থাকা বা অধ্যবসায়। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ঘোষণার পর এই শব্দটি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে ফিলিস্তিনিদের জীবনে সুমুদ বহু পুরোনো এক দর্শন—যা কেবল প্রতিরোধ নয়, বরং এক ধরনের জীবনের প্রতিজ্ঞা।

ইতিহাসে সুমুদের উত্থান

১৯৪৮ সালের নাকবা—ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, গ্রাম ধ্বংস, হত্যা ও বাস্তুচ্যুতি—তাদের জীবনে এক মহাবিপর্যয়।
এরপর আসে ১৯৬৭ সালের নাকসা, ছয় দিনের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ, যেখানে পশ্চিম তীর, গাজা, জেরুজালেমসহ বহু এলাকা দখল হয়।
এই দখল, ক্ষয় ও বেদনার মধ্যেই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে জন্ম নেয় এক নতুন বিশ্বাস—“যা-ই হোক, আমরা টিকে থাকব।”
এই টিকে থাকাটাই সুমুদ।

প্রাথমিক ধারণা

শুরুর দিকে সুমুদ মানে ছিল—
নিজের ঘর, জমি বা গ্রাম ছেড়ে না যাওয়া;
যতবার ঘর ভাঙা হোক, আবার তা গড়ে তোলা;
জলপাইগাছ কেটে ফেলা হলে নতুন গাছ লাগানো।
এই অটল স্থিরতাকে বলা হতো আস-সুমুদ আস-সাকিনু, অর্থাৎ দৃঢ় স্থিতি।

সুমুদ ও জাতীয় চেতনা

১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকে জর্ডান ও লেবাননের শরণার্থীশিবিরগুলোতে পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) সুমুদের চেতনা ছড়িয়ে দেয়।
তখন শরণার্থীশিবিরের বাসিন্দারা পরিচিত হন ‘সামিদিন’ বা দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবে।
১৯৭৮ সালে গঠিত হয় ‘সুমুদ সহায়তা তহবিল’, যার লক্ষ্য ছিল বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকতে সহায়তা করা—যেন তাঁরা নিজের ভূখণ্ড না ছাড়েন।

প্রতিরোধ থেকে জীবনযাপন

১৯৭০–৮০ দশকে সুমুদ পরিণত হয় প্রতিরোধের প্রতীকে—আস-সুমুদুল মুকায়িমু নামে পরিচিত এই ধরনটি ছিল সশস্ত্র ও সংগঠিত প্রতিরোধের প্রকাশ।
পরে প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (১৯৮৭–২০০৫) চলাকালে সুমুদের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়।
শুধু লড়াই নয়—দৈনন্দিন জীবনযাপনও হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অংশ।
বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো, বাজারে যাওয়া, ইসরায়েলি বাহিনীর তল্লাশি সহ্য করা, কিংবা প্রতিবেশীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা—সবই সুমুদ।

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিরোধ

ফিলিস্তিনি আইনজীবী ও লেখক রাজা শেহাদেহ সুমুদের এই রূপকে জনপ্রিয় করেন।
তাঁর ভাষায়—

“নিজের ঘরকে কারাগারে পরিণত হতে দেখা, তবু সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও একধরনের সুমুদ।
কারণ, এটাই আমার ঘর।”

তাঁর মতে, সুমুদ মানে কেবল প্রতিবাদ নয়—বরং মানবিকতা বজায় রেখে বেঁচে থাকা, প্রতিদিনের টিকে থাকা।

সংহতির সুমুদ

ফিলিস্তিনিদের বাইরে সুমুদ মানে হয়ে ওঠে সংহতি।
ইসরায়েলি দখলনীতি ও জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া,
দখলকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য বর্জন,
‘কেফিয়াহ’ রুমাল পরা,
অথবা ফিলিস্তিনের সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চায় অংশ নেওয়াও একধরনের সুমুদ।

জলপাইগাছ: টিকে থাকার প্রতীক

সহস্রাব্দ ধরে ফিলিস্তিনের মাটিতে জলপাইগাছ টিকে আছে।
যে গাছ বারবার ধ্বংস হয়, তবু আবার গজিয়ে ওঠে—তাই এটি সুমুদের প্রতীক।
ইসরায়েলের দখল ও আগ্রাসনে বহু পুরোনো জলপাইবাগান ধ্বংস হলেও ফিলিস্তিনিরা বারবার নতুন গাছ লাগিয়েছেন।
কবি মাহমুদ দারবিশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন—

“আমরা এখানেই মারা যাব…
একদিন আমাদের রক্ত থেকে
জন্ম নেবে কোনো জলপাইগাছ।”

শিল্প–সাহিত্যে সুমুদ

চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড ওয়াদি সাইদ লিখেছিলেন—

“সন্তান জন্ম দেওয়া, ঘর গড়া, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া কিংবা লড়াই করা—সবই সুমুদ।”

আর রাজা শেহাদেহ তাঁর Occupation Diaries গ্রন্থে বলেন—

“ফিলিস্তিনিদের গল্প বলে যাওয়া, তাদের স্মৃতি ধরে রাখা—এটাই আমার সুমুদ।”

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা

গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহর গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা এই দর্শন থেকেই নাম নিয়েছে।
ফ্লোটিলার মুখপাত্র সাইফ আবুকেশেক বলেন—

“৭৮ বছর দখলের মধ্যেও ফিলিস্তিনিরা টিকে আছেন।
প্রতিদিন নতুন আশায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন—
এটাই সুমুদের প্রকৃত অর্থ।”

সুমুদের সারকথা

সুমুদ হলো টিকে থাকার প্রতিরোধ।
অত্যাচারের মাঝেও মানবিকতার স্থিতি।
ভূমি, স্মৃতি ও মর্যাদাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার সাহস।

সুমুদ মানে—বেঁচে থাকার মধ্যেই প্রতিরোধ।