১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় দেশেই ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগ

WhatsApp Image 2025-10-08 at 16.22.35_ec3cdaa9

সারাদেশে ডেঙ্গু দিনদিন বেড়েই চলছে। দেশে এখন এক আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। দিনদিন আক্রান্তের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। এমন পরিস্থিতিতে দেশেই ডেঙ্গুর ভ্যাক্সিন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও আইসিডিডিআরবি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাক্সিন তৈরির এই উদ্যোগ সফল হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। তাঁদের মতে, দেশে এখন শুধু বৃষ্টির মৌসুমে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব হয়ে থাকে তা নয় বরং সারা বছর মানুষ কমবেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি বৃষ্টির মৌসুমে। এ সময় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই ব্যাপক হারে বাড়ছে।

ডেঙ্গু জ্বরের বংশ বিস্তারকারী এডিস মশা নিধনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। আর এখন ডেঙ্গু মশা শুধু কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, সব বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা থেকে গ্রামাঞ্চলে রয়েছে। তবে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব রাজধানীসহ শহরকেন্দ্রিক সর্বাধিক। বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যু দুটিই বাড়ছে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এ বছরে ডেঙ্গু মৌসুমে আক্রান্ত অর্ধ লক্ষাধিক ও ২১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

রাজধানীর দুইটি সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। এ বিশেষজ্ঞ কমিটিকে নিয়ে বছরের দুই-এক বার বৈঠক হলেও তাদের সুপারিশ কখনো আলোরমুখ দেখেনি বলে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য এ সত্যতা স্বীকার করেছেন। ঢাকার বাইরের সিটি করপোরেশনগুলোতে মশা নিধন কর্মসূচির একই অবস্থা। এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে মে মাস থেকে শীত আশার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ বৃষ্টি মৌসুমে এডিস মশার বংশ বিস্তার শুরু হয়। এই সময়কে ডেঙ্গুর মৌসুম বলা হয়ে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুরহার ব্যাপক হারে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে জায়গা পাওয়া দুষ্কর।

হাসপাতালগুলোতে শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য রোগী  হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দৈনিক শতাধিক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়। এ ছাড়া ২ হাজার ৬০০ বেডের এ হাসপাতালে রোগী ৪ সহস্রাধিক। ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা সামাল দেওয়া চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। আবার অনেক গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের আইসিইউর প্রয়োজন হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অন্যান্য রোগীদের চাপ প্রতিদিন থাকে। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদের চাপও যুক্ত হয়েছে। ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যেও রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া মুগদা, কুর্মিটোলা ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ সারা দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা একই।

Advertisements

মশা নিধন কার্যক্রম একাই সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা ঠিক নয়। বাড়ির মালিক, বাসাবাড়ি বাসিন্দাদের এর দায়িত্ব কম নয়। বাসাবাড়িতে ও আঙ্গিনায় জমা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করে। নিজেরাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

বৃষ্টির মৌসুম ছাড়া সারা বছর ডেঙ্গুতে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও আইসিডিডিআরবির সহযোগিতায় একটি ওষুধ কোম্পানি ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কার্যক্রম চলমান আছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া বিশ্বের কয়েকটি দেশে ডেঙ্গুর ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল চলমান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কার্যকর ভ্যাক্সিন বাজারজাত শুরু হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

এমিরেটস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বর একটি চিহ্নিত মশার কামড়ে হয়। এ মশার বংশ বিস্তার নিধন করলে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এডিস মশা নিধনে যত ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় প্রতি বছরে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। একই মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়া হয়। তিনি আরও বলেন, প্রতিরোধ ও প্রতিকারে উত্তম ব্যবস্থা না নিলে বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আক্রান্ত ও মৃত্যু দুটিই ব্যাপক হারে বাড়তে থাকবে। ভ্যাক্সিন যদি কার্যকরভাবে বাজারজাত করা হয় এটা হবে বাংলাদেশের জন্য সফল।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি রয়েছে। বছরে দুই-এক বার মিটিং হয় এবং সেখানে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়। একটিও বাস্তবায়ন হয়নি বলে একাধিক সদস্য জানান।

উত্তর সিটি করপোরেশনে রয়েছে মশক নিধন সংক্রান্ত জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি। তিন সদস্যের কমিটির অন্যতম সদস্য হলেন—মহাখালী জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার। এই সিটি করপোরেশনে বিশেষজ্ঞ কমিটি অনেক পরামর্শ দিয়ে থাকে। একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে এক সদস্য জানান। তা-ও বছরের দুই-এক বার সভা হয়। মশক নিধনের ব্যবস্থাপনার করুণ অবস্থা—তা সহজে বোঝা যায় বলে একজন সদস্য জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শ্যামলী ২৫০ বেডের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ হাসপাতালের প্রধান ডা. আয়েশা আকতার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা। কার্যকর টিকা যখন বাজারজাত করা হবে তখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে তিনি জানান।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, দেশে ডেঙ্গু প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন তৈরির উদ্যোগ একটি সুখবর। এটা সফল হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

Advertisements