১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

পুষ্টির অন্যতম শক্তি প্রোটিন

IMG_6119

একটা সময় ছিল, যখন খাদ্য মানেই স্বাদ ও পরিপূর্ণতার বিবেচনায় সীমাবদ্ধ ছিল। তৃপ্তি, ঐতিহ্য আর রন্ধনশৈলীর মধ্যেই আটকে ছিল খাওয়ার সংস্কৃতি। তখন খাবারে পুষ্টির চেয়ে প্রাধান্য পেত স্বাদ ও সামাজিকতা। কিন্তু সময় বদলেছে। খাদ্য আজ শুধুই আহার নয়, একধরনের জীবনদর্শন, এক ধরনের চিন্তার প্রতিফলন। সেখানে ‘প্রোটিন’ নামক উপাদানটি হয়ে উঠেছে নতুন সময়ের প্রতীক।

এই বদলে যাওয়ার পিছনে আছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা দ্রুত নগরায়ন, জীবনধারার জটিলতা, মানসিক চাপের বেড়ে যাওয়া, আর বিশেষভাবে কোভিড-পরবর্তী সময়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়ে বেড়ে ওঠা এক নতুন মাত্রার আগ্রহ।

প্রোটিন এখন আর শুধুমাত্র শরীরচর্চার অংশ নয়, বরং এক নিঃশব্দ বিপ্লবের ভাষা। এটা এমন এক শব্দ যা জিমের দেয়াল পেরিয়ে এসে ঘরের রান্নাঘর, কিশোর-কিশোরীর টিফিন বক্স, প্রবীণদের খাবারের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছে।

স্বাস্থ্য মানেই শুধু ছিপছিপে শরীর নয়, বরং ভিতর থেকে মজবুত থাকা। একসময় ফিটনেস বলতে বোঝাত শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য চিকচিকে ত্বক, সরু কোমর বা সুঠাম পেশি। কিন্তু এখন ‘ফিটনেস’ শব্দটি মানে এক অন্যরকম পূর্ণতা ভিতর থেকে জোর, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানসিক স্থিতি এবং শক্তির ধারাবাহিকতা।

এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রোটিন হয়ে উঠেছে অনিবার্য। কেননা, আমাদের শরীর প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি কোষ ক্ষয় করে। প্রতিটি কোষের পুনর্গঠন, প্রতিটি হরমোন উৎপাদন, প্রতিটি এনজাইম কাজ করে এই প্রোটিন নামক মৌলিক উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক ওজন প্রতি কেজিতে গড়ে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে সেই চাহিদার অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়। অনেকেই শুধু চাল ও আলু নির্ভর খাদ্যগ্রহণে অভ্যস্ত হওয়ায় শরীর পায় প্রচুর কার্বোহাইড্রেট, কিন্তু প্রোটিন থেকে যায় অবহেলিত।

Advertisements

বাংলাদেশি প্রাত্যহিক খাবার অনেক ক্ষেত্রেই কার্বোহাইড্রেট নির্ভর। সকালের নাশতায় রুটি, দুপুরে ভাত আর আলু ভাজি, রাতে আবার কারি এই চক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে  প্রোটিন প্রায় অনুপস্থিতই থেকেছে। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। অনেক পরিবার এখন সকালের নাশতায় দুধ, ডিম, ওটস, সেদ্ধ ছোলা কিংবা বাদাম রাখতে শুরু করেছে।

বাজারে এখন বেশি বিক্রি হচ্ছে গ্রীক দই, পিনাট বাটার, কেসিন ও হুই প্রোটিন। শুধু জিম করা মানুষ নয়, সাধারণ কর্মজীবী, গৃহিণী, এমনকি স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের খাবারের তালিকাতেও আসছে ডিম, চিজ, ডাল, দুধ, সয়া বা চিয়া সিডের মতো উপাদান।

এখন মজার ব্যাপার হচ্ছে রান্নাঘরে এখন অনেকেই নতুন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করছেন। মুগডালের চিলা, সয়াবিন কাটলেট, ডিমের সালাদ, কাবুলি ছোলার উপরে টক দই দিয়ে সালাদ, এমনকি মাশরুম দিয়ে বাঙালিয়ানা পদ তৈরি করছেন, যাতে প্রোটিন মাত্রা বেড়ে যায়।

অনেকেই মনে করেন প্রোটিন মানেই মাছ, মাংস বা ডিম। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ব্যাপারটা অনেক বেশি বিস্তৃত। উদ্ভিদভিত্তিক উৎসেও প্রোটিনের পরিমাণ কম নয়। ছোলা, মুগডাল, মটর, সয়াবিন, কাঁঠালের বীজ, তিল, চিয়া সিড, বাদাম, আলুবোখারার মতো অনেক খাবারেই রয়েছে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন ও ফাইবার।

বিশ্বজুড়ে ভেগানিজমের প্রসার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রাণিজ উৎসকে সীমিত করার প্রবণতা, এবং খাদ্যের প্রতি নতুন পরিবেশ-সংবেদনশীলতা এই সবকিছুর সমন্বয়ে উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন আজ বিশ্বজুড়ে এক নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের মানুষ এখনও পর্যাপ্ত প্রোটিন পাচ্ছেন না। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল নিউট্রিশন সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ৫ বছরের নিচে শিশুদের বড় একটি অংশ এখনও অপুষ্টিতে ভুগছে, যার অন্যতম কারণ প্রোটিন ঘাটতি।

গর্ভবতী মা, স্তন্যদায়ী নারী, প্রবীণ মানুষ, কিংবা শিশু—এদের প্রত্যেকের শরীরেই প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার প্রোটিন প্রয়োজন হয়। অথচ অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে পুষ্টির এই চাহিদা পূরণে খাদ্যতালিকায় তেমন কোনও ভারসাম্য রাখা হয় না। ফলে নানারকম দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, যার চিহ্ন তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না, কিন্তু দেহের ভিতর নীরবে ক্ষয় ঘটিয়ে চলে।

প্রোটিন সচেতনতা কেবল বিজ্ঞান বা স্বাস্থ্যপত্রিকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সাররা নিয়মিত প্রোটিন-রিচ রেসিপি শেয়ার করছেন। সুপারশপে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে “হাই প্রোটিন” ট্যাগ দেওয়া খাবার। শিশু খাদ্যে বড় করে লেখা থাকে প্রোটিন সমৃদ্ধ।

এমনকি অনেক ঘরে এখন মায়েরা সন্তানের টিফিনে চিপসের বদলে ডিম বা পনির রাখছেন। স্কুলগামী ছেলেমেয়েরাও জানে প্রোটিন খেলেই শক্তি আসে।

প্রোটিন এখন আর শুধু খাওয়ার একটি অংশ নয়। এটি  স্বাস্থ্যচেতনার পরিচায়ক এক ধরনের আধুনিক জীবনবোধের প্রতীক। খাদ্যকে শুধু স্বাদের জগৎ থেকে টেনে এনে মানুষ এখন তাকে শরীর, মন ও ভবিষ্যতের বাহক হিসেবে ভাবছে। এই প্রোটিন সচেতনতা একধরনের গভীর সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয় যেখানে মানুষ নিজ শরীর, নিজের খাবার, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের পুষ্টি নিয়ে যত্নবান হচ্ছে। এটি নিঃশব্দ বিপ্লব বটে, তবে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাই প্রতিদিনের আহারে পুষ্টির অন্যতম উপাদান প্রোটিন রাখুন।

Advertisements