কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো পিছিয়ে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি নারীরা। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন অর্থনীতিতে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। জাতিসংঘের মতে, টেকসই উন্নয়ন তখনই নিশ্চিত হবে যখন রাজনীতি ও সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বেকার নারীর সংখ্যা বাড়ছে। এরমধ্যে উচ্চশিক্ষিতরাই বেশি। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেলে অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পুরুষের পাশাপাশি সমান কাজ নারীরাও করছে। সারাদিন একজন পুরুষ একটি কাজ করে যে উপার্জন করে একজন নারীও একই কাজ করে তাঁর অর্ধেক মজুরি পায়।
পুরুষের সঙ্গে সমান তালে ভার বয়ে এগিয়ে চলা এসব নারীর কর্মস্পৃহাতেই যেন লেখা হয়েছে, বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পুরুষের চেয়ে নারীর অনুপাত বেশি। তবে শ্রমশক্তিতে পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে নারীরা। সাড়ে ২৫ লাখ বেকারের মধ্যে প্রায় ৯ লাখই নারী। উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যেই বেকারত্ব বেশি। বৈষম্য, সামাজিক অবকাঠামো, কাজের পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় অনেক নারীই আগ্রহ হারাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রের ওপর থেকে। এমন হলে দেশের অর্থনৈতিক পরিধি বৃদ্ধিতে বাধা আসবে বলে মত বিশ্লেষকদের।
নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি কেন?
পারিবারিক দায়িত্ব – গৃহস্থালি কাজ, সন্তান ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নারীদের ওপর বেশি থাকে। তাই অনেকে চাকরির বাজারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে না। অনেক সমাজে এখনও মনে করা হয় নারীর প্রধান ভূমিকা পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে নয়। ফলে নারীদের কাজের সুযোগ কমে যায়। কর্মস্থলে হয়রানি বা যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাহীনতা নারীদের চাকরির আগ্রহ ও সুযোগ কমায়। অনেক খাতে পুরুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, নারীরা তুলনামূলক কম সুযোগ পান। একই কাজের জন্য নারীরা অনেক সময় কম বেতন পান, ফলে অনেক নারী চাকরি করতে আগ্রহ হারান। অনেক নিয়োগকর্তা মনে করেন মাতৃত্বজনিত কারণে নারীরা দীর্ঘ সময় কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন না। উচ্চপদে নারীদের সুযোগ কম, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায়ও তাদের সংখ্যা কম।
নারীদের বেকারত্ব কমাতে হলে কি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
সমান সুযোগ ও মজুরি নিশ্চিত করা
প্রতিটি কাজে নারীদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারী বলে যে কোনো কাজ সে করতে পারবে না এটা না ভেবে প্রতিটি কাজে নারীদের সমান সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমান মজুরি দিতে হবে। একজন পুরুষ একই কাজ সারাদিনে করে যে মজুরি পায় কিন্তু একজন নারী ওই কাজ করে তার অর্ধেক মজুরী পায়। তাই এ দিকটি খেয়াল রাখতে হবে যেন নারীরা সমান মজুরি পায়।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধ
এখনও নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না। প্রতিনিয়ত নারীরা কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হয়। ফলে দেখা যায় অনেক নারী তাদের চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন নীতিমালা তৈরি করতে হবে এবং সেই নীতিমালার যেন সঠিক প্রয়োগ হয় এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া
প্রতিটা নারীরই বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা সব কাজেই অংশগ্রহণ করতে পারে। দক্ষ না হওয়ার কারণে যেন তারা কোনো কাজে পিছিয়ে না পড়ে। এজন্য ফ্রিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে যাতে নারীরা অংশ নিতে পারে।
পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানো
নারীদের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ নিয়ে যদি সমাজে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তাহলে হয়তো নারীদের কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। শুধু সমাজ না পরিবারকেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
নারী বলেই যে সে কাজটি করতে পারবে না এ ধরনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। কর্মক্ষেত্রে যেন নারীরা হেনস্তার শিকার না হয়, কর্মক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিভিন্ন যৌক্তিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং নারীর মানবাধিকারের প্রতি সম্মানবোধ থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া নারীবিদ্বেষী প্রচার-প্রচারণার বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সচেতন থাকা প্রয়োজন তাহলেই নারীরা এগিয়ে যাবে।



