Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

নারী পাচার বন্ধ হোক

বাংলাদেশে নারী পাচারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। এটি একটি সামাজিক সমস্যা। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারী পাচারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি। তবে বাংলাদেশে নারী পাচারের ঘটনা গত কয়েক বছরে কিছুটা কমলেও করোনাকালে তা আবার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে! নারী পাচারের এসব ভীতিকর তথ্য দেশের অর্থনীতিকে ম্লান করে দেয়। আর নারীরা যখন অন্য দেশে পাচার হচ্ছে তখন বহির্বিশ্বেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। নারী ও শিশু পাচারের এসব ঘটনার যেনো কোনো সুরহা মিলছেই না। এক্ষেত্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও অধিকগুণ বৃদ্ধি না করলে এই চক্রগুলোর হদিস পাওয়া মুশকিল!

২০২০ সালের মানব পাচার তথা টিআইপি বা বৈশ্বিক ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি) সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়েছিল। টায়ার মাইনাস টু থেকে টায়ার টুতে উন্নীত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই এই অগ্রগতির প্রশংসা করেছিল। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ নারী-পুরুষ ও শিশু পাচার হয়েছে। প্রতিবছর ২০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যায়। অপর এক হিসাবে দেখা যায়, ভারতে অথবা ভারত হয়ে অন্য দেশে ৫০ হাজার নারী পাচার হয়ে গেছেন।

২০২০ সালে মানব পাচারের যে ৩১২টি মামলার বিচার হয়, সেগুলোর ২৫৬টি ছিল নারী পাচার ও যৌন সহিংসতা-সংক্রান্ত। পাচারকারী এই চক্রগুলো প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছে। যেই পরিকল্পিত অভিনব কৌশলের ফাঁদে দিচ্ছে এদেশের অসহায় নারীরা।

মূলত এই চক্রে জড়িত লোকজন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থেকে তাদের ফাঁদ পেতে চলেছে। বাইরে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে নারীকে কব্জা করে এরা। এছড়া বর্তমান নারী পাচারের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে টিকটক সেলিব্রিটি, উচ্চ বেতনের চাকরি, আবার চক্রের সদস্যরা নারীকে সহজে আয়ত্তে আনতে একাধিক বিয়ে করছে। এবং নারীকে বাইরের দেশে বিক্রি করে দিচ্ছে। এসব ঘটনায় একেবারেই যে কেউ আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি তা নয়। বরং প্রতিনিয়ত তারা ভোল পাল্টে আবারও নতুন কৌশল রপ্ত করছে। নারী পাচারে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশকে আরও ভুগতে হবে!

রাজধানীর ডেমরার মালা মার্কেট এলাকা থেকে টুম্পা আক্তার রূপা ওরফে ইভা নামের এক কন্যাসন্তানের জননী মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ভারতে পাচার হওয়ার পর খুন হয়েছেন। ইভার পারিবারিক ও ডেমরা থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে চাকরির কথা বলে ইভা ২০২১ সালের ২০ মে ঘর থেকে বের হয়ে যান। এর পরে ইভাকে খুলনায় আলমগীর মৃধার বাড়িতে রাখা হয়। পরবর্তীতকালে দেশি-বিদেশি মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা দিয়ে ইভাকে প্রথমে ভারতের মুম্বাই শহরে পাচার করে আসামি আল আমিনের বাসায় রাখা হয়। ওখানে ইভার সঙ্গে আরও কয়েকজন মেয়ে রেখে অনৈতিক কাজ করিয়ে টাকা রোজগার করতো বৃষ্টি, নবাব ও আলী হোসেন। মুম্বাইয়ে রেখেই প্রথমে অভিযুক্তরা ইভার নামে ভারতীয় জাতীয় পরিচয়পত্র ও আধার কার্ড তৈরি করে। এদিকে গত ২৬ জানুয়ারি ভারতের গুজরাট পুলিশ ইভার বাবাকে মোবাইল ফোনে জানায়, তার মেয়ের লাশ গুজরাটের বারুচ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এটি যে আদৌ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় তা ঘটনার সারসংক্ষেপেই স্পষ্ট।

তবে নারীদের এমন করুণ পরিণতি আর কত! নারী ও শিশু পাচার রোধে আজও যথেষ্ট সচেতন নয় কেন জনগণ ও সরকার। দেশে কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে নারীরা বাইরে সুযোগ সৃষ্টি হলে তা লুফে নিতে চেষ্টা করে৷ কিন্তু জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কেন নারীরা এমন ফাঁদে পা দিচ্ছে!

নারী পাচার রোধে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকারের পক্ষে আইন করে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নির্মূল করা সম্ভব নয়। বরং জনগণকে সচেতন হতো হবে। সবচেয়ে বেশি নজরদারি বাড়াতে হবে সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর। গুপ্তচর নিয়োগ করে নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একমাত্র উদ্যোগ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। এছাড়া কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। মানব পাচারকারীর একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত মৃত্যুদ্বন্দ্ব। জীবনের ভয় হয়তো বা এ সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ