Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মুখে জন্মদাগ: তাতেও নারীর দোষ!

গত ২ সেপ্টেম্বর নারী উদ্যোক্তা সানজিদা লিমাকে নিয়ে ‘প্রথম আলো’য় একটি আর্টিক্যাল প্রকাশিত হয়েছে। মুখে জন্মদাগ থাকার কারণে এই নারীকে নানরকম মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তার অনলাইন উদ্যোগটির নাম ‘অরোরা’। অনলাইনে ছবি দেওয়ার জন্য তাকে শিকার হয় নানারকম বাজে এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের। কিন্তু তার প্রশংসিত কাজে সাধুবাদ ও শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে আমাদের সমাজের মানুষেরা বুলিং করেছেন তাকে। কিন্তু কেন? মুখে জন্মদাগের দায় কি তার?

বিষয়গুলো কোনোটিই ছোট নয়। বরং বৃহৎ পরিসর নিয়ে সমাজের মাঝে ঘুণেধরা জীবনের দিকে ইঙ্গিত দেয় বারবার। বলতে গেলে শুধু সানজিদাই এ ধরনের মানসিকতার বলি হচ্ছেন না। বরং সমাজে নারীদের ছোট করতে, বিকৃত, অশ্লীল মন্তব্য করতে মুখিয়ে থাকে এক শ্রেণি। স্রষ্টার সৃষ্টিকে বিদ্রূপ করার আগে এই মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যদি ভাবতে চেষ্টা করতেন, তারা কী বলছেন? কেন বলছেন? তার চেয়ে বড় কথা মানুষের প্রতি এরূপ বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি তাকে কতটা সঠিক মানুষে পরিণত করেছে? এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় প্রসঙ্গক্রমে চলেই আসে, এই মানসিকতাসম্পন্নরাই আবার নারীকে সঠিক পথের দিশা দিতে ব্যানার হাতে রাস্তায় নামে। যারা নিজেরাই কোনটি ঠিক, কোনটি বেঠিক, সেই দিশার সন্ধান আজও পাননি।

একরাশ ঘৃণা জন্ম নেয় মনে, যখন দেখি মানুষ হয়ে অন্য মানুষের প্রতি বিরূপ মন্তব্য, বিরূপ আচরণ করা হয়। বর্তমান মানুষের মেরুদণ্ড বলে কি আদৌ কিছু আছে? না কি কেঁচোর মতো মেরুদণ্ডহীন প্রাণীতে রূপ নিয়েছে আজকালকার মানুষ! নারীর প্রতি শ্রদ্ধা কোনোদিন পুরুষতন্ত্রের ছিল না কিন্তু তার ফল এতটা বিক্ষিপ্ত ছিল না। বর্তমান সমাজের মাঝে কেমন যেন একটা নাভিশ্বাস, একটা দম বন্ধ করা পরিস্থিতি। কোথাও যেন নারী তার প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছে না। নারীকে অপদস্ত করা হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়ে। কিন্তু কেন এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি? নারীরা কি আমাদের জগতের বাইরের কেউ? কেন সানজিদারা বিরূপ মন্তব্যের শিকার হবেন? কেন নরসিংদী রেলস্টেশনে নারীর হাতে নারীকে অপদস্ত হতে হবে। কোথায় নারীর নিরাপত্তা?

সাইবার বুলিংয়ের শিকার নারী (প্রতীকী ছবি: ইন্টারনেট থেকে)

সানজিদা মেয়েটির বয়স মাত্র ২৪। তিনি আপনার আমার কী ক্ষতি করেছেন? বারবার তাকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বুলিংয়ের শিকার করে তুলছেন তথাকথিত সমাজিক জীবেরা? প্রথম আলোর কলামটি পড়ে দমবন্ধ করা কষ্ট বুকের মাঝে চিন চিন করে উঠেছে ক্ষণে ক্ষণে। আমরা এই সমাজের বাসিন্দা? যেখানে একজন নারী তার সামান্য মুখের জন্মদাগ নিয়ে চিন্তিত। বুলিংয়ের শিকার। শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রত্যাখ্যানের শিকার। আমাদের সমাজের যারা খুব বেশি নারীর পোশাক নিয়ে মাতামাতি করতে শুরু করেছেন, আপনারা কী এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নন? সানজিদাকে কেন হেনস্তা করছেন? কেন তাকে ভাবতে বাধ্য করাচ্ছেন এ সমাজ, এই জগৎ তোমার জন্য নয়?

সানজিদার মুখের জন্মদাগের কারণে তাকে সামজিক বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও তার প্রতি ছুড়ে দেওয়া হয় অশালীন মন্তব্য। তার মুখের দাগের জন্য তার প্রতি যতটা ক্ষোভকে তুলে ধরেন এসব বিকৃত রুচির-মানসিকতার মানুষ, ঠিক ততটা তার মাকেও দোষারোপ করা হয়। অনেকেই তাকে উদ্দেশ করে বলেন, তার মায়ের কোনো পাপের ফলে মেয়ের মুখে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শুধু বুলিংয়ের শিকারই নন, বরং চাকরি প্রার্থী হয়ে কোথাও ইন্টারভিউ দিতে গেলেও সেখানে তিনি ঘুরেফিরে তার মুখের দাগ নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মাঝে পড়েছেন। অর্থাৎ পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলেছেন আমাদের কথিত শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সমাজ। তার ভাষ্য মতে,
‘মাঝে মাঝে মনে হয় প্লাস্টিক সার্জারি করে মুখ থেকে দাগটি চিরতরে দূর করে দিই। তবে আমার নিজের পরিবার ও স্বামী এ জন্মদাগটিকে খুব সহজভাবে মেনে নিয়েছেন। তাই মন খারাপ হলেও আবার সাহস পাই সামনে চলার জন্য’। বলতেই হয়, তার মাঝে যে অশান্তির জন্ম দিয়েছেন, বাজে মানসিকতার মানুষেরা, সেই অশ্লীল মন্তব্যের দায় কি কেউ এড়াতে পারবেন?

আমরা সামজিক জীব। পরিবারের মাধ্যমে বেড়ে ওঠে সবাই। কিন্তু বর্তমানে পরিবারগুলোও কী তাদের সন্তানের মানসিক বিকাশের দিকে লক্ষ রাখছেন না? অন্য নারীর প্রতি এধরনের মন্তব্যের জের ধরে আপনার সন্তানটি যে আপনাকেও একদিন ঘাড় ধরে ধাক্কা দেবেন না বা অশ্লীল আচরণ করবে না তার কী নিশ্চয়তা? পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মানুষের প্রতি মানবিক হওয়ার শিক্ষা দেওয়া জরুরি আমাদের সন্তানদের। নতুবা জাতি মুখ থুবড়ে পড়বে নিশ্চিত। বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেখানেও জাতির সুস্থ মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

নারীকে বুলিং (প্রতীকী ছবি: ইন্টারনেট থেকে)

বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের কর্ণধার কিন্তু এই কমোলমতি শিশু, কিশোর-তরুণ-যুবাদের মানসিকভাবে এতটা অস্থিতিশীলতা, বিকৃত, অশ্লীল মন্তব্য, আচরণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। সত্যি জাতি এক বড় অসুখে ভুগছে। সেটা রুচির বিকৃতি, মানসিক অস্থিরতার। দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি। বড়দের কাছে শুনতে পাই, আগে বয়স্কদের দেখে গণপরিবহনে সিট ছেড়ে দিতো অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা। শিক্ষকদের দেখলে শিক্ষার্থীরা বিনয়ের সঙ্গে অন্য রাস্তা ধরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতো লুকিয়ে। কিন্তু বর্তমান সমাজে না আছে শিক্ষদের নিজের সম্মানবৃদ্ধি করার প্রক্রিয়া, না আছে শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে মানবিক গুণসম্পন্ন করে তোলার বাসনা। সবাই যেন কোনো অদৃশ্য দৈত্যের অশুভ ছায়ার নিচে নিজেদের মাঝে হানাহানি, অত্যাচার- নিপীড়নে ব্যস্ত। নারীর প্রতি অকথ্য মন্তব্যে নিজেদের পাশবিক আনন্দ উপোভেগে ব্যস্ত।

জাতির এরূপ ক্রান্তিলগ্নে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। ইনকটারনেটের অযাচিত ব্যবহারের প্রতিও সচেতন হতে হবে প্রতিটি মানুষকে। এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলন, সেমিনার, সভা, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে বর্তমান অজারক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে পরিত্রাণ ঘটাতে হবে। সানজিদা থেকে শুরু করে প্রত্যকটি নারী যেন কোনোরকম বাজে মন্তব্যের শিকার না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে সন্তানদের মানবিক হওয়ার শিক্ষা দেওয়াটা বেশি জরুরি। ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করার চেয়ে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে সন্তানের বিকাশ কেমন, সেটা বোঝা জরুরি। যান্ত্রিক জীবনে একে অন্যের সঙ্গে কে আগে যাবে, সেই পাল্লায় মানুষ হওয়ার বাসনাটাই বর্তমান মানুষের মধ্যে ফিকে হয়ে গেছে। ফলে সহিংসতা দেখা দিচ্ছে। সময় হয়েছে দিন বদলের। এখন থেকেই যদি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র পরিবর্তনের সুর না তোলে, তবে সামনে আরও কালোদিন, ঝড়ো হাওয়ায় সব তছনছ হওয়ার যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে! আসুন আমরা নিজেরা মানুষ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করি। অন্যকে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হওয়ার শিক্ষা দেই। নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে শুরু করি। আর নারী নিরাপদ মানে জাতি বিপদহীন। ফলে জাতিকে সুরক্ষিত করার এখনই সঠিক সময়। ঘরে ঘরে গড়ে উঠুক সচেতনতা। নিরাপদ হোক মা, কন্যা, বোনের পথচলা। চিন্তাহীন হোক মানুষের স্বভাবিক জীবনযাত্রা।