নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৮

নাদিয়া মুরাদের নোবেল বক্তৃতা

নোবেল ভাষ

নাদিয়া মুরাদের নোবেল বক্তৃতা
নাদিয়া মুরাদের নোবেল বক্তৃতা
ঐক্য আমাদেরকে শক্তি দিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর সম্মিলিত চেষ্টায়ই আমরা আইসিসের অপরাধের তদন্ত শুরু করতে পারব; একদিন তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারব যারা আইসিসকে স্বাগত জানিয়েছিল, আইসিসকে যারা ইরাকি ভূখ- দখল করতে সাহায্য করেছিল। আইসিস-পরবর্তী ইরাকে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার কোনো স্থান থাকবে না। দেশ গড়ার কাজে আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। ইরাকের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

 

নাদিয়া মুরাদ ইরাকের ইয়াজিদি মানবাধিকারকর্মী এবং নোবেলজয়ী নারী। মাত্র ২১বছর বয়সেই প্রত্যক্ষ করেছেন জীবনের কুৎসিত বীভৎসরূপ। ইরাকের সংখ্যালঘু ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়ে হয়ে তিনি দেখেছেন চরমপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী আইসিসের বর্বরতা। নিজেও তাদের হাতে বন্দি হয়েছেন, হয়েছেন নির্যাতনের শিকার। যৌনদাসী হিসেবে তারা তাঁকে বিক্রি করে দেয়। সিরিয়ান, ইরাকি, তিউনিসিয়ান ও ইউরোপিয়ান ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। এক সময় জঙ্গিদের হাত থেকে পালাতে সক্ষম হন নাদিয়া। চলে আসেন জার্মানি। ইয়াজিদি গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি। ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন, যার জন্য তাঁকে শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, ওপর নোবেলজয়ী কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মুকওয়েজি। নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের হয়ে কথা বলবার এক কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন এই নোবেলজয়ী। নিজের জীবনের এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি লিখেছেন ‘দ্য লাস্ট গার্ল : মাই স্টোরি অব ক্যাপটিভিটি, অ্যান্ড মাই ফাইট এগেইনস্ট দ্য ইসলামিক স্টেট’ নামের একটি বই, ২০১৭ সালে।

১০ ডিসেম্বর ২০১৮, নরওয়ের অসলোতে সেই অভিজ্ঞতার বয়ান করছিলেন তিনি, তার বক্তৃতায়।

 

উপস্থিত সম্মানিত অতিথি এবং নোবেল কমিটির সদস্যদের প্রতি আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা। আমার বন্ধু ড্যানিস মুকওয়েজ, যিনি যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য কাজ করেছেন এবং নিজেই সেই নারীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন, যে-নারীরা যুদ্ধে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তার সঙ্গে যৌথভাবে মূল্যবান এই পুরস্কার প্রাপ্তি এক অনন্য সম্মান।

আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আপনাদের সঙ্গে এখানে কথা বলতে চাইছি এবং আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছি কীভাবে আমার পুরো জীবন এবং ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোকদের জীবন বদলে গেছে গণহত্যার কারণে, এতদিন ধরে এত মৃত্যু আর সংঘাতের ভিতর এখনও আমি বেঁচে আছি কথাগুলো বলবার জন্য। আমি আজ বলতে এসেছি সেসব মানুষদের কথা, ইরাকের অন্যতম একটি প্রাচীন সম্প্রদায়ের কথা আইসিস যাদেরকে মাটি থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে চেয়েছিল তাদের নারীদেরকে বন্দি করে, পুরুষদের হত্যা করে; আমাদের কাছে যেসব স্থান পবিত্র ছিল সেসব এবং আমাদের ধর্মমন্দিরগুলোকে তারা চেয়েছিল ধুলোয় মিশিয়ে দিতে, আজ এখানে সেসব কথাই বলতে এসেছি।

আজকের দিনটি আমার জন্য বিশেষ একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ এমনই এক শুদ্ধতম দিন, যখন মুক্তবুদ্ধি ও মঙ্গলবোধের জয় হয়েছে ঘৃণা ও অমঙ্গলের বিরুদ্ধে, মানবতা আজ সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করতে পেরেছে, আজ ক্যাম্পে ক্যাম্পে নির্যাতন ভোগ করা শিশু ও নারীরা মুক্তি পেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে জয় হয়েছে।

আশা করছি, আজকের দিনটি নতুনের এক সূচনাচিহ্ন হিসেবে পৃথিবীর বুকে অঙ্কিত হবে, যেখানে একমাত্র শান্তিই প্রধান হয়ে বিরাজ করবে, পুরোবিশ্ব এককাতারে দাঁড়িয়ে নতুন এক রোডম্যাপ তৈরি করবে- নারী, শিশু এবং সংখ্যালঘুদেরকে নির্যাতন থেকে, বিশেষ করে যৌনসহিংসতার শিকার নারীদেরকে রক্ষা করার জন্য।

ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় শিঞ্জারের কোচোয়, গ্রামের মেয়ে হয়েই আমি আমার শৈশব কাটাচ্ছিলাম, জানতামও না নোবেল শান্তি পুরস্কার কী, জানতাম না সারাবিশ্বে প্রতিদিন ঘটে চলা এত এত যুদ্ধ সংঘাত আর মৃত্যু সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কিছু। মানুষ যে কখনও মানুষেরই বিরুদ্ধে এত করাল, এত বীভৎস এত কুৎসিত অন্যায় করতে পারে তাও জানা ছিল না, আমার।

হ্যাঁ, আমিও স্বপ্ন দেখতাম; কিশোরীদের মতোই আমি স্বপ্ন দেখতাম হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করছি। আমার সে স্বপ্নে ছিল লেখাপড়ার চুকিয়ে গ্রামে একটি বিউটিপার্লার দেওয়ার  কথা। স্বপ্ন ছিল নিজেদের গ্রামেই সবাই একই দুঃখে একই সুখে একত্রে বসবাস করব। একদিন হঠাৎ সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করল। স্বপ্নকে দখল করে নিল গণহত্যা। আমি মাকে হারালাম, ছয় ছয়টি ভাইকে হারালাম, ভাইদের বাচ্চারাও হারিয়ে গেল চিরকালের জন্য। প্রতিটি ইয়াজিদি পরিবারের এই একই গল্প; ভয়ানক নিষ্ঠুরতার গল্প এই গণহত্যার, মানুষের ভাষা যে নির্মমতাকে কোনোদিনও বর্ণনা করতে পারবে না!

হ্যাঁ, রাতের মধ্যেই আমাদের জীবন পুরোটা বদলে গেল, অনেক কিছুর বিনিময়ে যে বদলটি এল, তাঁকে আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না; ইয়াজিদিরা কোথায় হারিয়ে গেল, পরস্পর থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তারা। শান্তিবাদী একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনের সমস্ত বন্ধনকে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে ফেলা হলো, যারা ছিল এমন এক সমাজের মানুষ শান্তির পতাকাকে যারা সর্বদা উর্ধ্বে তুলে ধরত। সংস্কৃতির প্রতি তাদের ছিল বিন¤্র মমতা, শ্রদ্ধা আর লালনের আকাক্সক্ষা। সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় একটি যুদ্ধের জ্বালানি হলো তারা, শান্তির পতাকাটি পুড়তে লাগল আগুনে।

ইয়াজিদিদের ইতিহাসে বহু গণহত্যার কথা আছে; শুধুমাত্র ভিন্নতর বিশ্বাস এবং ধর্মের কারণেই বারবার আমাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে; হাতেগোনা কয়েকটিমাত্র ইয়াজিদি পরিবার তুরস্কে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এক সময় সিরিয়ায় ইয়াজিদিদের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার, তাদের ৭৫ হাজারজনকেই ইতিমধ্যে হত্যা করা হয়েছে, বেঁচে যাওয়া ৫ হাজারের জীবনও বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন। ইরাকেও ইয়াজিদিরা একই পরিণতি ভোগ করছে। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে জীবিত ইয়াজিদির সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। আইসিসের উদ্দেশ্য যেখানে ইয়াজিদিদের নির্মূল করা, যদি না কেউ তাদেরকে রক্ষা করে, তাহলেই আইসিসের উদ্দেশ্য শতভাগ পূরণ হবে। ইরাক ও সিরিয়ার অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও ঠিক একই অবস্থা।

ইরাক ও কুর্দিস্থান সরকারের শোচনীয় ব্যর্থতার পর আন্তর্জাতিকসম্প্রদায়ও আইসিসের হাত থেকে, তাদের নিষ্ঠুর গণহত্যা থেকে আমাদেরকে রক্ষায় ব্যর্থ হলো। একটি সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি তারা দেখছিল শুধু আর আমরা পৃথিবী থেকে মুছে যাচ্ছিলাম। আমাদের ঘরবাড়ি, পরিবার, ঐতিহ্য, ইতিহাস, আত্মীয়স্বজন, আমাদের লাল নীল স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা সমস্ত কিছু একদিন পৃথিবীর বিষণœ ধুলোয় মিশে গেল।

গণহত্যায় নিশ্চিহ্ন হবার পরই আমরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের সহানুভূতি লাভ করি, কিন্তু তার আগে নয়। আমরা যখন মরুভূমির ধুলোয় মিশে গেছি, কেবল তখনই বহু দেশ গণহত্যার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু তাতে কি গণহত্যা বন্ধ হয়েছে? আমাদেরকে নির্মূল করবার হুমকি এখনও অব্যাহত আছে।

আইসিসের হাতে বন্দি ইয়াজিদিদের দুর্দশার কোনো অন্ত নেই। তারা ক্যাম্প থেকে পালাতে পারবে না, আইসিসের ধ্বংসস্তূপের পুনর্নির্মাণও সম্ভব নয়। এখনও, গণহত্যার অপরাধীদেরও বিচারের সম্মুখীন করা যায়নি। আমি সমবেদনা কিংবা সহানুভূতি চাই না, আমি চাই আমার এসব অনুভূতিকে অনুবাদের মাধ্যমে আপনাদের কাছে তুলে ধরতে যাতে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি গণহত্যার ভিক্টিমদের পাশে দাঁড়ায়, যদি আমরা ক্যাম্পগুলো থেকে ইয়াজিদিদের মুক্ত করে তাদের নিজেদের গ্রামে ফিরিয়ে দিতে পারি, যদি আবারও তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারি, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে তাদেরকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে পারবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুরক্ষা ব্যতীত কোনোভাবেই এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না যে অন্যকোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দ্বারা সংগঠিত গণহত্যায় আমরা মারা যাব না। তাদের জন্য অবশ্যই এসাইলাম এবং ইমিগ্রেশন সুবিধা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে, যারা গণহত্যার ভিক্টিম।

ইরাকিদের জন্য আজকের দিনটি বিশেষ, প্রথম ইরাকি হিসেবে আমার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির জন্যই শুধু নয়, আজ এমন বিশেষ একটি দিন যখন আমরা বিজয় উদযাপন করছি, ইরাকি ভূখ-কে আইসিসের দখল থেকে মুক্ত করার জন্যও আজকের দিনটি একটি বিশেষ দিন। উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ সর্বত্র ইরাকিরা আজ ঐক্যবদ্ধ, দীর্ঘ এক যুদ্ধে তারা শামিল হতে পেরেছে; আজ তারা যুদ্ধ করছে পৃথিবীর পক্ষে, চরমপন্থা আর সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর বিপক্ষে।

ঐক্য আমাদেরকে শক্তি দিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর সম্মিলিত চেষ্টায়ই আমরা আইসিসের অপরাধের তদন্ত শুরু করতে পারব; একদিন তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারব যারা আইসিসকে স্বাগত জানিয়েছিল, আইসিসকে যারা ইরাকি ভূখ- দখল করতে সাহায্য করেছিল। আইসিস-পরবর্তী ইরাকে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার কোনো স্থান থাকবে না। দেশ গড়ার কাজে আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। ইরাকের শান্তি, নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

আমাদের প্রতিদিনই মনে পড়বে- সন্ত্রাসবাদী আইসিস এবং তাদের সমর্থকদের কথা, যারা ইয়াজিদিদের ওপর যে নজিরবিহীন বর্বরতা চালিয়েছিল ২০১৪ সালে, যে-ইয়াজিদিরা ইরাকী জনগোষ্ঠীর একটি অন্যতম অংশ ছিল, তাঁদেরকে তারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। কেবলমাত্র ইয়াজিদি বলেই তারা এমন গণহত্যা চালিয়েছে, যে-ইয়াজিদিদের আছে ভিন্নতর ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রথা, আচরণ, ঐতিহ্য; যারা ছিল সকল প্রকার হত্যার বিরুদ্ধে, যারা ছিল মানুষকে বন্দি বানানোর বিপক্ষে এবং মানুষকে ক্রীতদাস বানাবার বিপক্ষে।

এই একবিংশ শতাব্দীতেও, বিশ্বায়ন ও মানবাধিকার স্বীকৃতির এই চূড়ান্ত সময়েও, সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি ইয়াজিদি শিশু ও নারীকে বন্দি করে রাখা হয়েছে; তাদের পণ্যের মতো কেনাবেচা চলছে, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে তারা। একবিংশ শতাব্দীতেও এটা সম্ভব হচ্ছে! ২০১৪ সাল থেকে আমাদের প্রতিদিনের চিৎকার সত্ত্বেও ৩ হাজার ইয়াজিদি শিশু ও নারীর ভাগ্য আইসিসের হাতে, আমরা জানিই না কি হবে তাদের! মেয়েগুলি, জীবনের সোনালি সিঁড়ির প্রথম ধাপে যারা মাত্রই পা দিয়েছিল, তাদেরকে বিক্রি করা হচ্ছে যৌনদাসী হিসেবে, ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হচ্ছে, সেখানে প্রতিদিনই তারা ধর্ষিত হচ্ছে। এটা আমাদের এখনও অজ্ঞাত যে বিশ্বের ১৯৫টি দেশের একটিও দেশও তাঁদেরকে রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। কারণটি কি বাণিজ্যিক কোনো চুক্তি নাকি তেলক্ষেত্র নাকি অস্ত্রের বড়ো কোনো চালান? শুনুন, এই মেয়েগুলোকে মুক্ত করাটা নিশ্চয়ই খুব কঠিন কাজ ছিল না আপনাদের জন্য!

প্রতিদিনই আমরা ট্র্যাজিক গল্পগুলো শুনছি। সারা পৃথিবীতে আজ কয়েক মিলিয়ন শিশু ও নারী সংঘাত ও সহিংস নির্মমতার শিকার। প্রতিদিনই আমরা সিরিয়া, ইরাক আর ইয়েমেনি শিশুদের অসহায় গোঙানি শুনছি! প্রতিদিনই দেখছি আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে নারী ও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে। কেউ তাদেরকে রক্ষায় এগিয়ে আসছে না, অপরাধীরাও পার পেয়ে যাচ্ছে, বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না কাউকেই।

চার চারটি বছর ধরে বিশ্বের বহু দেশে আমি আমার গল্প বলতে গিয়েছি, সেখানে আমি আমার সম্প্রদায়ের দুঃখের কথা বলেছি, সেই সঙ্গে বলেছি পৃথিবীর অন্যান্য অরক্ষিত মানুষদের কথাও, যারা আজ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ। ইয়াজিদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের ওপর চালান যৌন নিপীড়নকারীদের এখনও বিচার হয়নি। বিচার যদি না হয়, তাহলে যে কোনোদিন আবারও আমাদের বিরুদ্ধে, আবারও অন্যান্য নিরাপত্তাহীন সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যার কালোরাত নেমে আসবে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। ন্যায়বিচারই একমাত্র পথ যা নিশ্চিত করতে পারবে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান। আমরা যদি নারীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌনদাসিত্বের পুনরাবৃত্তি না চাই তাহলে যেভাবেই হোক অপরাধিকে শাস্তি প্রদান করতেই হবে, যারা যৌন নির্যাতনকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নারী, বিশেষ করে ছোট্ট মেয়েদেরকে পাশবিক অত্যাচার করেছিল।

আজকের এই সম্মাননার জন্য ধন্যবাদ। সত্য কথাটি হচ্ছে, পৃথিবীতে সেটাই হবে একমাত্র পুরস্কার যা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে আমাদের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেবে এবং অপরাধীর শাস্তি দিতে পারবে। এমন কোনো পুরস্কার নেই যা আমাদের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষদের ফিরিয়ে দিতে পারে, যাদেরকে কেবলমাত্র ইয়াজিদি হওয়ার কারণে গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে। আমাদের জন্য সেটাই একমাত্র পুরস্কার যখন আমরা আবারও একটি সাদামাটা জীবন শুরু করতে পারব বন্ধু পরিজনদের সঙ্গে নিয়ে, নিশ্চিত হবে ইয়াজিদিদের জন্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষা।

বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৭০তম বর্ষ উদ্যাপন করেছি আমরা, যার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল গণহত্যা বন্ধ করা আর অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা ৪ বছরের বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যার শিকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ গণহত্যা বন্ধে শুধু যে ব্যর্থই হয়েছে তা নয়, এতটুকু বাধা পর্যন্ত দেয়নি। এ পর্যন্ত তারা কোনো অপরাধীকেই বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দুর্বল জাতিগুলো শিকার হয়েছে জাতিগত নিধনের, বর্ণবাদের, আত্মপরিচয় হারানোর, তাও একেবারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখের সামনে।

ইয়াজিদিসহ পৃথিবীর নামাপ্রান্তের অরক্ষিত সম্প্রদায়গুলোকে রক্ষাসহ তাদের মানবাধিকার নিশ্চত করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারী ও শিশুঅধিকার, বিশেষ করে সেইসব অঞ্চলগুলোয় যেখানে সংঘাত এবং যুদ্ধ চলছে, তা রক্ষা করা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সংস্থাগুলোর দায়িত্ব।

‘প্যারিস শান্তি সম্মেলন’-এ থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার, সম্মেলনে উদ্যাপিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার একশ বছর। কিন্তু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কতগুলো যুদ্ধ আর কতগুলো গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে? গণহত্যার ভিক্টিমদের সংখ্যা কেউ গুণে শেষ করতে পারবে? না, পারবে না। পৃথিবী সবকিছু জানে, একটি গণহত্যার কথাও তার অজ্ঞাত নয়। যাই হোক, যুদ্ধ এড়ানো যায়নি; যুদ্ধ একদিনের জন্য বন্ধও হয়ে যায়নি, এসব যুদ্ধের সবই যে বিশ্বযুদ্ধ তা নয়; কিন্তু ছোট ছোট যুদ্ধ পৃথিবীর সর্বত্রই লেগে আছে! যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, বারবার যুদ্ধ এসে দরোজার কড়া নেড়েছে।

হ্যাঁ, এটা সত্য যে বিশ্বজুড়ে নানা উত্তেজনা, সংঘাত, সংঘর্ষসহ বহু মারাত্মক সমস্যা রয়েছে, তা সত্ত্বেও ন্যায় বিচারের পথও তো একেবারে রুদ্ধ হয়ে যায়নি, ভিক্টিমদের পাশে দাঁড়ানোও অসম্ভব কিছু নয়।

বাদেন-ইয়ের্তেমবার্গ (ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ড-সীমান্তবর্তী জার্মানির দক্ষিণপশ্চিম ফেডারেল স্টেট), এবং মি. ক্র্যাচম্যানের (এই স্টেটের মিনিস্টার প্রেসিডেন্ট) সহৃদয় সহায়তা ছাড়া আজকের দিনটির চমৎকার স্বাধীনতা উপভোগ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না এখানে আইসিস-এর অপরাধ এবং ইয়াজিদিদের যন্ত্রনার কথা জনসম্মুখে বলা! আমার বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট- যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততোক্ষণ সকল ভিক্টিম নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে চায়।

সভ্য সমাজের পুষ্টিবিধানে শিক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সভ্য মানুষরা শান্তি ও সহনশীলতায় আস্থাশীল থাকে। আমরাও আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দেব, তাদের নিষ্পাপ মনে ঘৃণা আর বিভক্তির বদলে সহনশীলতা ও সহাবস্থানের বাণী লিখিত হবে। নারীরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি রক্ষার কাজটি করবে। নারীর নিজের একটি কণ্ঠ এবং তার সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের সম্প্রদায়গুলোতে নানামত্রিক পরিবর্তন আনবে।

ইয়াজিদিদের জন্য আমি গর্ব বোধ করি, গর্ব বোধ করি তাদের শক্তি, ধৈর্য আর সহনশীলতার জন্য। আমরা বহুবার গণহত্যার টার্গেটে পরিণত হয়েছি, তাতে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে; যদিও আমরা অস্তিত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনও বন্ধ করিনি, লড়াই চলছেই। ইয়াজিদিরা শান্তি ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক, এখন তারা পুরো বিশ্বের জন্যই একটি উদাহরণ!

আজকের এই চমৎকার দিনটিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই তাদের প্রতি যারা আমাদেরকে বেঁচে থাকবার শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন, ধন্যবাদ জানাতে চাই তাঁদেরকে যারা আমার কথাগুলোকে আপনাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। টিমের সেইসব সদস্যের কথা বলব, যারা উদয়াস্ত আমার পাশে থেকেছেন।

আমি সেই দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যারা ইয়াজিদি গণহত্যাকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন, স্বীকার করেছেন; সেইসব দেশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যারা বিপন্ন সম্প্রদায়গুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াকে ধন্যবাদ, ইয়াজিদি গণহত্যার ভিক্টিমদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। যুক্তরাজ্যকে ধন্যবাদ, একটি আন্তর্জাতিক টিম তৈরি করে দেওয়ার জন্য, আইসিসের অপরাধ তদন্তে যারা সাহায্য করবে। ধন্যবাদ ফ্রান্স এবং প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে, ইয়াজিদিদের মানবিক সাহায্যের জন্য। ইরাকি কুর্দিস্থানের জনগণকে ধন্যবাদ, বিচ্ছিন্ন মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কুয়েতের বাদশা এবং নরওয়ে সরকারকেও ধন্যবাদ, ‘কনফারেন্স ফর দ্য রিকন্সট্রাকশন অব ইরাক’ আয়োজনের জন্য। বন্ধু আমাল ক্লুনি ও তার টিমকে ধন্যবাদ, ইয়াজিদি নারীদেরকে যৌন দাসত্বের হাত থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে আইসিসের বিচার চাওয়ার জন্য। উদ্বাস্তুর স্রোতকে নিজেদের ভূখ-ে আশ্রয় দেওয়ার জন্য গ্রিসের জনগণকে ধন্যবাদ।

অবিচার আর অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলি চলুন, চলুন একতাবদ্ধ হই; চলুন আমরা কোরাসে : সহিংসতাকে না বলি, শান্তিকে বলি হ্যাঁ; দাসত্বকে না বলি, মুক্তিকে বলি হ্যাঁ; জাতি ধর্ম ও বর্ণের প্রতি বৈষম্যকে না বলি, হ্যাঁ বলি সমতা ও সবার জন্য মানবাধিকারের পক্ষে। নারী ও শিশুদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারকে না বলি, হ্যাঁ বলি তাদের মর্যাদা ও স্বাধীন জীবনের জন্য। শাস্তি থেকে অপরাধীর অব্যাহতিকে না বলি, তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পক্ষে বলি হ্যাঁ, এবং হ্যাঁ বলি- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে।

আপনাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। ধন্যবাদ, এতক্ষণ আমার কথা শুনবার জন্য। সবাই যেন স্থায়ী শান্তিতে থাকতে পারি, সবশেষে এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি। 

 

ভাষান্তর : এমদাদ রহমান