Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রহস্যময়, অদ্ভুত অথচ সুন্দর একটি গল্প – “পিয়ানো”

কিছু কিছু গল্পই থাকে এমন! ঠিক আচমকা এক বুনো মুহূর্তে আপনি মুভির গল্পের প্রেমে পড়ে যাবেন। পিয়ানো মুভিটা দেখার সময়েও সেই একই একটি মুহূর্তের আগমন ঘটে। দুজন পরিত্যক্ত এবং সমাজের শূন্য দৃষ্টিতে মানানসই নয় এমন দুজন মানুষের প্রেমের গল্প পিয়ানো। কিন্তু শুধু কি প্রেম? না, কখনো কখনো দর্শক ভয় পেয়ে যেতে পারেন। 

 

পিয়ানো নিউজিল্যান্ডের তীরবর্তী এক ছোট অঞ্চলের গল্প বলে। এখানকার মানুষ বিষণ্ণ একঘেয়ে বৃষ্টি আর প্যাচপ্যাচে কাঁদায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় সমাজের ফেলে আসা কঙ্কালের উপর কোনোমতে তারা বেঁচে আছে নিজেদের সাথে। গল্পটা কখনো লাজুক, কখনো নিপীড়নের, এবং অনেকটুকু জুড়েই শুধু চাপা আর্তনাদ ও বিষণ্ণতার। ঠিক এজন্যেই এই মুভির গল্পটা অদ্ভুত, রহস্যময় এবং কিছু কিছু জায়গায় ভয়ংকর।

অদ্ভুত তো বটেই। গল্পের মূল চরিত্রে এক নারী যে কথা বলতে পারেনা, এবং বিপরীতে এমন একজন যে শুনতে পায়না কিছু। আর হ্যাঁ, একইসাথে আরও একজন নারী চরিত্র আছে, যে কিনা অসংখ্য বাজে কাজ করে বেড়ায়, অথচ অভিনয় করে বোঝায় তার কোনও দায় নেই। এমনকি সমালোচকরাও এই মুভিটি মুক্তির পর একে নানাভাবে রহস্যময় বলে রায় দিয়েছেন। তবে ঠিক ২৭ বছর পর আমরা মুভিটিকে কীভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করি? 

 

মূলত গল্পের বস্তুবাচকতা এবং যৌনতার সাথে মানিয়ে নেয়া এবং অস্বীকার করার জটিলতা যেকোনো দর্শককে পীড়া দিবে। আর হ্যাঁ, মৃত্যুকামনার প্রতি ভীষণ আকর্ষণ ও মোহের ভার তো বাদ দেয়া চলেনা। সেই জন্যেই হয়তো পুরো মুভি জুড়ে নিঃশব্দ এবং নিস্তব্ধতা। 

পিয়ানো একটি অদ্ভুত এবং মৌলিক গল্প। একদম শুরুতে অনেকেই জন কিটসের কোনও কবিতার গল্প বলে ঠাহর করেছিলেন। কেউ তো ভাবছিলেন বুকার শর্ট-লিস্টের কোনও নভেল থেকে আবার গল্পটা নেয়নি তো? কিন্তু এই মুভির কাব্যিক উপস্থাপনা এতটাই মৌলিক যে আপনাকে মুভির পর্দায় নিরলস-ভাবেই তাকিয়ে থাকতে হবে। 

 

মধ্য উনিশ শতকের গল্প। আমরা দেখতে পাই এডা তার মেয়ের সাথে স্কটল্যান্ড থেকে নিউজিল্যান্ডের নর্দার্ন আইল্যান্ডে চলে আসে। এখানেই এডার বাবা স্টুয়ার্ট নামে একজনের সাথে তার বিয়ে দিয়েছে। এই বিষণ্ণ তীরবর্তী অঞ্চলে এডা, তার মেয়ে ফ্লোরা এবং এডার প্রিয় একটা পিয়ানো। কিন্তু এডার স্বামী সেই পিয়ানো জর্জ নামে এক প্রতিবেশীর কাছে পিয়ানোটুকু বিক্রি করে দেয়। এতদিনের প্রিয় পিয়ানো হারানোর পর এডার মন টিকছে না। জর্জ অবশ্য তাকে একটি অফার দেয়। যদি সে জর্জকে ক্যাবিনে এসে পিয়ানো শেখায়, তাহলে সে পিয়ানোটি ফেরত দিবে। তবে জর্জের মধ্যকার কামনা এবং লোভাতুর স্বভাবটুকু আস্তে আস্তে প্রকাশ হয়ে পরে। যৌনতা এখানে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে অবশ্যই কাজ করেছে। অথচ আস্তে আস্তে দুজনের সম্পর্ক অনেকটা কমনীয় এবং অদ্ভুত হয়ে ওঠে। 

 

পিয়ানোর মাধ্যমেই এডা নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এমনকি এমন মুহূর্তও আসে যখন এডা তার প্রেমিককে পিয়ানোর মাধ্যমে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করতে শুরু করে। আসলে ভালোভাবে গুছিয়ে বলতে গেলেও কেমন অদ্ভুত একটি অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হয়। কোনোভাবেই বোঝা যায়না একে কীভাবে ব্যখ্যা করবো। গল্পের প্রবাহ এবং কাব্যিকতা অন্য-ভুবনের খোঁজ দেয়। হাতছানি দিয়ে বেড়ায় এমন এক আবেগের, বিষণ্ণতার যা আসল বলে মনে হয়না। মনে হয়না প্রেম আছে অথচ প্রেম যেন এখানেই আসে।  মূলত একজন বোবা নারীর গল্প নিয়ে এত সুন্দর উপস্থাপনা সত্যিই কঠিন ছিলো। যৌনতা এই মুভির একটি বিশাল অংশ তবে একে যৌন-উত্তেজক বলে রায় দেয়াটা ভুল হবে। 

 

যেমনটা বলেছিলাম, পিয়ানো অনেকটা বস্তুবাচক হয়ে উঠেছে। সামান্য একটি পিয়ানোকে ভর করে পৃথিবীকে বদলে দেয়া যেতে পারে। সেটা সামান্য একটি তীরবর্তী অঞ্চলই হোক না কেন! বৃষ্টি নামুক কি না নামুক, বিষন্নতা ভর করুক! জীবনে প্রেম আসবে, বিশ্বাসঘাতকতা এবং অপমান আসবেই। সেটা সামান্য একটি অঞ্চলেই হতে পারে। পিয়ানো যেন মানুষের ভেতরকার জগতের সাথে বাহ্যিকতার সেতুবন্ধন গড়ে দিতে চেয়েছে।