Skip to content

১১ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বেলা শেষে অপুর সংসারে ফেরা হল না ফেলুদার

 

"মৃত্যু আয় তিনপাত্তি খেলি আয়" এখানে ভাদ্রির কড়া রোদ আছে, ভ্যাপসা একটা গরম আছে, রাস্তার মাঝখানে কুকুরের সঙ্গম আছে।
সবি আছে শুধু মৃত্যুর সাথে তিনপাত্তি খেলতে খেলতে মানুষটাই আর রইলেন না। বলছি সদ্য প্রয়াত নক্ষত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। আজ বেলা ১২ টা বেজে ১৫ মিনিটে বেলভিউ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।

বেলা শেষে অপুর সংসারে ফেরা হল না ফেলুদার

মাসখানেক আগে কোভিড সাসপেক্ট হয়ে ভর্তি হাসপাতালে হন। গত ৫ অক্টোবর করোনার পজিটিভ রিপোর্ট আসে। পরবর্তীতে তিনি কোভিড মুক্তও হন। তবে বয়সের সাথে শরীরে যে ভাঙ্গন হয়েছে তা কোভিডের কব্জায় থেকে লড়াই করার ক্ষমতাকে হার মানিয়ে দিতে বাধ্য করে। তাঁর চলে যাওয়া যেন বাংলা চলচ্চিত্র সংস্কৃতি নিজের একযুগ হারিয়ে ফেলেছে।
জীবনানন্দ বলে গিয়েছিলেন নক্ষত্রদেরও নাকি একদিন মরে যেতে হয়। হয় নাকি! হয় তো বটেই। তবে নক্ষত্ররা মরে গেলেও হারিয়ে যায় না । তাঁরা বেঁচে থাকেন কাজে, বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টিতে।

বেলাশেষে দেখতে দেখতে যে বিষন্নতা তৈরি হয়েছিল তার ক্ষয় ঘটার আগেই সে বিষন্নতার সুর আজ এক নক্ষত্রের প্রয়াত হওয়ার মধ্য দিয়ে হৃদয় গভীরের শেষ বিন্দুতে বিঁধে রয়েছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যতখানি সৌমিত্র তারথেকেও বেশি যেন ফেলু মিত্তির, অপু কিংবা প্রাক্তনের রেল গাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখায় বেশি পরিচিত।
সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে বড় পর্দায় পা রাখেন এই কিংবদন্তি। 'অপুর সংসারে' অর্পণা ঘোষে বিপরীতে থেকে য সুক্ষ্ম প্রেমের রচনা করিছলেন তার যেন আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে প্রেমছবির মত ভেসে আছে।

বেলা শেষে অপুর সংসারে ফেরা হল না ফেলুদার
তারপর একের পর এক ছক্কা। পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ছিপছিপে গড়নের এই সুপুরুষ নিজের যৌবন দীপ্ত তারুণ্য নিয়ে উপহার দিয়েছেন ফেলু মিত্তিরের মত চরিত্র। এতটাই মনে শে গেছেন এই চরিত্রে যেন এটা তাঁর নিজেরই জীবনগল্প। অথচ পরিচালক সত্যজিৎ রায় সেসময় সৌমিত্রকে ভেবেই ফেলুদার চরিত্র লেখা। উত্তমকুমারের পরে বাঙালি মেয়েদের মনে সেসময় ঝড় তুলতে পেরেছিলেন এই দীর্ঘাঙ্গ সুপুরুষ নায়ক। এমনকি সেসময়ে তপন সিনহার ' ঝিন্দের বন্দি' ছবিতে বাঙালি উত্তম – সৌমিত্রের অভিনয়ের লড়াই দেখেছে। তাক লাগিয়ে দেওয়া অভিনয় ছিলো। এরপরেও দেবদাস, স্ত্রী, যদি জানতাম ছবিতে একসঙ্গেই দেখা গিয়েছিল এই অবর্ণনীয় অভিনয় প্রতিভার অধিকারী দুই নায়ককে। চলচ্চিত্র ছাড়াও সৌমিত্র জায়গা করে নিয়েছেন বাংলা সাহিত্যেও। কবিতায় ছিল দারুণ দখল। আবৃত্তির গলা শুনলে শরীরের পশমে কাটা দিয়ে যায় এখনো।
সিনেমার প্রতি ভালোবাসার জোরই হয়তো এই নায়ককে বাঁচিয়ে রেখেছে এতকাল। জীবনের শেষ বয়সেও সিনেমা প্রেম তাঁকে ছাড়েনি। নতুন চরিত্র অন্য প্রেমের গল্প নিয়ে বারবার পর্দায় ফিরেছেন তিনি। উপহার দিয়েছেন বসু পরিবার, ময়ূরাক্ষী, প্রাক্তন, সাঁঝবাতি, বেলাশেষে, শ্রাবণের ধারার মত কালজয়ী সব সিনেমা।

১৯৩৫ সালের ১৯শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্ম এই কিংবদন্তির। তৎকালে বাড়ীতে নাটকের প্রচলন ছিল। সেখান থেকে আগ্রহ জন্মে অভিনয়ের প্রতি। যেই আগ্রহ রুপালি পর্দায় ৬০ বছরের উপরে টিকিয়ে রেখেছেন এক অসম্ভবী মন জয়ী অভিনেতাকে। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সফল পদচারণা ছিল মঞ্চাভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশনা, কবি হিসেবে ও।

বেলা শেষে অপুর সংসারে ফেরা হল না ফেলুদার

মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকেনা বেলা ফুরিয়ে যায়, একথা যেমন সত্য তেমনী শিল্পীদের মৃত্যু নেই একথাও সত্য । শিল্পীরা বেঁচে থাকে সৃষ্টির মাধ্যমে। যেমন সৌমিত্রও বেঁচে থাকবেন বেলাশুরুর নতুন গল্পে। বেঁচে থাকবেন ফেলুদা’র মতন অ্যাডভেঞ্চার আর অভিযানে। বেঁচে থাকবেন রেল গাড়ির কামরায় প্রাক্তনের মুখ খুঁজে বেড়াবার মাঝে। বেঁচে থাকবেন হঠাৎ দেখায়, রাতের তারাদের দিনের আলোর গভীরে লুকিয়েছে থাকার মতন। বেঁচে থাকবেন সিনেমা প্রেমী প্রতিটি বাঙালী হৃদয়ে।

 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ