Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হ্যারিয়েট টাবম্যান: ব্ল্যাক মোজেস

 

মেরিল্যান্ডের ক্রীতদাস বাবা ও ক্রীতদাস মায়ের ঘরে তাঁর জন্ম। মা বাবাকে পায়ে চেন বেঁধে ধরে আনা হয়েছিল আফ্রিকার কোনো এক দেশ থেকে। জন্ম হয়েছিল ১৮২০-২২ সালে। বাবা বেসজামিন রোসা। মায়ের নাম হ্যারিয়েট গ্রিন। তাঁর নাম রাখা হয়েছিল আরমানিটা। পরে আরমানিটা মায়ের নামটা গ্রহণ করেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সেই তাকে কঠিন সব কাজে নিয়োজিত করা হয়। ঠিক সেই সময় একটা বড় হাতুড়ি ছুঁড়ে তার মাথার খুলি ভেঙে দিয়েছিল একজন ক্রীতদাসের দেখাশোনার লোক। এই ভাঙা খুলি নিয়ে তিনি যা করেছেন তা আর দশটা ভাল-খুলির মানুষ করতে পারবে বলে কেউ ধারণা করে না। আর সেই মানুষটা যদি মেয়ে মানুষ হয়? মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু অসুবিধা ছিল না তার।

 

১৮৪৪ সালে টাবম্যান নামের একজন ক্রীতদাসকে বিয়ে করেন তিনি। পাঁচ বছর পর তাদের মালিক মারা গেলে সকলে ধরে নেয় তাদের সকলকে আবার অন্য কোথায় বিক্রি করে দেওয়া হবে। এইসব দেখে শুনে একদিন হ্যারিয়েট টাবম্যান বাড়ি থেকে পালান। চলে যান উত্তরে যেখানে ক্রীতদাস তখন মুক্ত মানুষ। কিংবা যেখানে ক্রীতদাস-প্রথা কোনো কালেই ভয়াবহ নয়। তাঁর পালানোটা এত ঝুঁকিপূর্ণ ভাবাও যায় না। অন্টারিওর সেন্ট ক্যাথারিনে পালিয়ে যান। প্রথমে পালিয়ে ছিলেন ফিলডালফিয়াতে। পরে সেখান থেকে অন্টারিওর সেন্ট ক্যথারিনে। তাঁর জীবনীকারকে বলেন : যখন আমি উত্তরে পালিয়ে আসি প্রথমে আমি দু হাত মেলে দেখেছিলাম এগুলো আমার হাত কিনা। আমি কি একই মানুষ? জীবনের এই উজ্জ্বলতা কি আমার? কিন্তু নিজে পালিয়ে এসে কেবল মুক্তির স্বাদে ও আনন্দে গান গাইবেন তাহলে তিনি হারিয়েট টাবম্যান কেন? মনে পড়ছে তাদের কথা যাদের তিনি ফেলে এসেছেন। মনে পড়ছে আরো নানা সব ক্রীতদাস আর ক্রীতদাসীর কথা।  ওরা কবে মুক্ত হবে? এ চিন্তা কখনো সরে আসতে পারেননি।

 

এরপর চুপিচুপি তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের কানে দিলেন উত্তরের স্বাধীন আলোয়, ভেতরে বেঁচে থাকার, মুক্তির আলোর কথা। এরপর আরো উনিশবার তিনি সেখানে গেছেন। এবং ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন এবং আরো অনেককে উত্তরে আসতে সাহায্য করেছেন। ঘটনাটি যেমন এক বাক্যে শেষ করা যায় তেমন সহজ ছিল না। যারা ক্রীতদাস ধরবার জন্য ইঁদুর মারার কলের মত কল বিছিয়ে রেখেছেন সেই সব পার হয়ে আসতে হয় তাদের। যাদের আছে বড়বড় গ্রে হাউন্ড। যে সব কুকুর পথের ধূলি শুঁকে বলে দিতে পারে কোন দিকে গেছে এইসব কালো মানুষ। এবং কোথায় লুকিয়ে আছে তারা। তাঁকে ধরবার জন্য সেইসময় চল্লিশ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তিনি অবিচলিত। যদি মারা যাই যাব তবু ওদের মুক্ত করব। ১৮৫৭ সালের ভেতর পুরো পরিবারকে মুক্ত করেন। বাবা মায়ের বয়স তখন সত্তর পেরিয়ে গেছে। পিঠে একটা বন্দুক নিয়ে আগে আগে চলেন তিনি। যারা ভয়ে কাতর, বলেন তাদের, উত্তরে চল। না হলে এখানে মর। ক্রীতদাস হয়ে থাকার চেয়ে সেটাই উত্তম। তাঁর দৃপ্ত সাহসের আলোতে, প্রদীপ্ত পদক্ষেপের সাহসে এইসব কালো মানুষ খুঁজে পান সাহস। মোজেসের মত সমুদ্রের ভেতরে পথ খুঁজে নেন তিনি। অকুতোভয় এক নারী।

 

ক্রীতদাস প্রথার বিরোধী জন ডগলাস বলেন তাকে, আমি এমন কাউকে জানি না যিনি তোমার মত সাহস রাখে। তবে জন ব্রাউনও সাহসী। সে পুরুষ। আর তুমি নারী। এত কষ্ট, এত দুঃসহ পথ ভাঙবার সাহস কি করে পেলে তুমি? হ্যারিয়েট টাবম্যান অনেকদিন থেকেই জনব্রাউনের সঙ্গে কাজ করছিলেন। তাঁরা ভার্জিনিয়ার দাসত্বপ্রথা তুলে দেবার জন্য প্রাণপণ করেছেন। নানা সভাসমিতিতে বক্তৃতা করেন তিনি। জন ব্রাউনও করেন।

 

১৮৫৮ সাল পর্যন্ত হ্যারিয়েট টাবম্যান সেন্ট ক্যাথারিনেই বাস করতেন। এরপর চলে আসেন নিউইয়র্কে। সিভিল ওয়ারের সময় তিনি কাজ করেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে তিনি শতশত আহত সৈন্যদের সেবা করেন। নতুন মুক্ত ক্রীতদাসদের শেখান অনেক কিছু। এখানে কখনো তাকে গুপ্তচরের কাজ করে নানা সব খবর এনে দিতে হতো।

 

 

যুদ্ধ শেষ হয়ে হলে টাবম্যান ক্রীতদাসদের জন্যই কাজ করে যান। দক্ষিণ কারোলাইনাতে মুক্ত ক্রীতদাসদের জন্য স্কুল তৈরি করেন। তাদের জ্ঞান দিতে হবে, অক্ষর শেখাতে হবে। ১৮৯৬ সালে আফ্রো-আমেরিকান ওম্যানদের ন্যাশনাল ফেডারেশনের মহা সভায় যোগ দেন তিনি। দৃপ্ত কণ্ঠের বাণীতে অনেকেই সেদিন জেগে ওঠেন। যেখানে তিনি বলেছিলেন: আমাদের মত বয়স্কদের জন্য বাড়ি চাই। সেই বছরই নিজের বাড়ির সঙ্গে পঁচিশ একর জমি কেনেন। নিজের বাড়ি সংলগ্ন জমি। তখন তিনি অবার্নে বাস করতেন। যেখানে হ্যারিয়েট টাবম্যান অবহেলিত নিগ্রোদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। আশ্রম বানিয়ে ছিলেন। নানাভাবে টাকা তুলে এটা চালাতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই আশ্রম আর সব মহতী মানুষের পরিশ্রমে ও সহযোগিতায় অনেকদিন জেগে ছিল।
কিন্তু তাঁর জীবনের শেষের দিকে নিদারুণ অভাবে কাটে। অন্যদের জন্য দিতে দিতে যখন তিনি নিঃশেষ হন।

 

গৃহযুদ্ধের পর চলে গেল আরো তিরিশ বছর। এরপর নানা কিছু ভেবে তৎকালীন সরকার তাঁকে মাসিক বিশ ডলার পেনশন দেন, যুদ্ধে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সেই কথা চিন্তা করে।

 

তিরানব্বই বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় মারা যান তিনি। মানুষের মুক্তির উজ্জ্বল মশাল হিসাবে এখন সকলে তার নাম মনে করে। মারা যান ১৯১৩ সালের দশই মার্চ নিউইয়র্কের অবার্নে। ১৮৬৯ সালে তাঁর প্রিয় বান্ধবী জীবনী লেখেন হ্যারিয়েট টাবম্যান ব্ল্যাক মোজেসকে নিয়ে।  নাম: সিনস ইন দ্য লাইফ অফ হ্যারিয়েট টাবম্যান।

 

দাসত্বের জীবন থেকে পালিয়েছিলেন স্বাধীনতার আলোতে। যে কালো নারী সবসময় পিস্তল নিয়ে পথ চলতেন আর ভাবতেন নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে অন্যকে কিভাবে রক্ষা করব? এ ছাড়াও তিনি সুসান বি আন্টনির সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন নারী যেন ভোট দেবার ক্ষমতা পায় এই কারণে। দিতে দিতে নিজের জন্য কিছু না রাখার জ্বলন্ত উদাহরণ এই কালো মোজেস। তিনি একবার বলেছিলেন যতদিন আমার শরীরে শক্তি আছে আমি নারীর জন্য, ক্রীতদাসের ও অবহেলিত মানুষের জন্য সংগ্রাম করে যাব। সকলে তাকে জানে পাতালরেলের সাহসী নারী হিসাবে। সেখানে তিনি ট্রেন চালানোর সময় চিন্তা করেছেন সকলের অসহায়তার কথা। বলেন: কোনদিন আমি কোন এক্সিডেন্ট করিনি আর কখনো আমি মানুষের, নারী-পুরুষের সমান অধিকারের চিন্তা থেকে সরে আসিনি।

 

সকলের সমান অধিকারের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। প্রদীপ্ত এই নারী কখনো কোন প্রতিরোধকে মেনে নেননি। আজ তাকে সকলে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে। বলে, কালো মোজেস তোমার সাহস তুলনাহীন।