৫ নভেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২০ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

সারাক্ষণ কানে ইয়ারফোন, অজান্তেই হারাচ্ছেন অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ

IMG_7466

ঢাকার ব্যস্ত জীবনে যানজট, মানুষের কোলাহল কিংবা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই সারাক্ষণ কানে ইয়ারফোন বা হেডফোন লাগিয়ে রাখেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে অফিসে যাওয়া, ঘরের কাজ এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত গান, পডকাস্ট কিংবা নানা ধরনের অডিওতে ডুবে থাকেন অনেকে। তবে এই অভ্যাস অজান্তেই অন্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহারের প্রভাব শুধু শ্রবণশক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি নিজের চিন্তাভাবনা ও চারপাশের পরিবেশের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাসেও প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্কের মতে, মানুষ অনেক সময় অজান্তেই অন্যদের থেকে নিজেকে আড়াল করতে হেডফোন ব্যবহার করে। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডসের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ডেভিডসনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হেডফোনের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের অনেক সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ হারাচ্ছে।

তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাডিসন ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশের কানে হেডফোন দেখা যায়। অথচ এক দশক আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিভিন্ন পরিবেশ ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, কথা বলা এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবাই যদি নিজের পছন্দের অডিওতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। একই চিত্র দেখা যায় কফিশপ, গণপরিবহন কিংবা অপেক্ষার জায়গাগুলোতেও। পাশের মানুষের সঙ্গে সামান্য কুশল বিনিময় বা হাসিমুখে কথা বলার সুযোগও হারিয়ে যায়।

শুধু সামাজিক যোগাযোগ নয়, সব সময় হেডফোন ব্যবহারের কারণে নিজের সঙ্গে নীরবে সময় কাটানোর অভ্যাসও কমে যেতে পারে। গ্লোরিয়া মার্কের মতে, মানুষ এখন নীরবে বসে থাকা কিংবা একঘেয়েমিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার অভ্যাস হারাচ্ছে। বিরক্তি অনুভব করলেই ফোন বা হেডফোনের মাধ্যমে তা দূর করার চেষ্টা করছে।

Advertisements

অথচ কিছু সময় নীরব থাকা, নিজের চিন্তাভাবনা বোঝা এবং চারপাশের পরিবেশের প্রতি মনোযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

এর একটি উদাহরণ নিউইয়র্কের ২৪ বছর বয়সী আতিরা গালি। প্রতিদিনের প্রায় সব কাজেই তার সঙ্গী ছিল হেডফোন। গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি তার স্পটিফাইয়ের বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, তিনি ৩৩ হাজার ৫০০ মিনিট গান শুনেছিলেন।

একসময় নিজের এই অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন জাগে তার মনে। গান ছাড়া স্বাভাবিক কাজগুলো উপভোগ করতে পারছেন কি না, তা বুঝতে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গান না শোনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিনের মধ্যে নিজের পরিচিত এলাকায় নতুন চারটি দোকানের সাইনবোর্ড দেখতে পান। অথচ প্রতিদিন একই পথ দিয়ে যাতায়াত করলেও আগে সেগুলো তার চোখে পড়েনি। তার উপলব্ধি, হেডফোন কানে থাকলে সাধারণত মাথা নিচু করে হাঁটেন বলে আশপাশের পরিবেশে কী ঘটছে, তা খেয়াল করা হয় না।

অবশ্য হেডফোন ব্যবহার নিজেই খারাপ কিছু নয়। ব্যস্ত শহরে এটি বিনোদন ও একঘেয়েমি কাটানোর ভালো মাধ্যম হতে পারে। তবে সব সময় কানে কিছু একটা শুনতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তাই নিরাপদ পরিবেশে কিছু সময়ের জন্য ইয়ারফোন খুলে রাখা, চারপাশের শব্দ শোনা, মানুষের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিজের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে হয়তো প্রতিদিনের পরিচিত পথেও নতুন কিছু চোখে পড়বে, আর ফিরে পাওয়া যাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ছোট ছোট সুযোগ।

Advertisements