৪ নভেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন

798-68d00c9d904a3

হার্ট অ্যাটাক এমন একটি জরুরি শারীরিক অবস্থা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ বুকে ব্যথা, চাপ কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অনেকেই গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা ভেবে অপেক্ষা করেন। কেউ আবার ব্যথা কমে যাওয়ার আশায় বিশ্রাম নিতে থাকেন। কিন্তু এমন বিলম্ব বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ, হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে হৃদপেশি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখা, অযথা নড়াচড়া বন্ধ করা এবং প্রয়োজন হলে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন পরিস্থিতিতে প্রথম পাঁচ মিনিটে কী করবেন, জেনে নিন।

প্রথম মিনিট: কাজ বন্ধ করে জরুরি সহায়তা ডাকুন

বুকে চাপ, ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হার্ট অ্যাটাকের অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সব কাজ বন্ধ করুন। হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম করবেন না।

দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় ফোন করুন। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

দ্বিতীয় মিনিট: আরামদায়ক অবস্থানে বিশ্রাম নিন

আক্রান্ত ব্যক্তিকে পিঠে ভর দিয়ে আরামদায়কভাবে বসান। আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন এবং অযথা নড়াচড়া করতে দেবেন না। আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।

আক্রান্ত ব্যক্তি একা থাকলে কাছের কাউকে খবর দিন এবং দরজার তালা খুলে রাখুন, যাতে উদ্ধারকারীরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন।

Advertisements

তৃতীয় মিনিট: লক্ষণ ও সময়ের তথ্য মনে রাখুন

বুকে ব্যথা বা অন্য উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, তা মনে রাখুন। ব্যথা শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ছে কি না, শ্বাসকষ্ট বা ঘাম হচ্ছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখুন।

আগে থেকে হৃদরোগের ওষুধ ব্যবহার করলে চিকিৎসক বা জরুরি সেবাকর্মীকে সে তথ্য জানান। আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার ইতিহাস ও অ্যালার্জির তথ্য জানা থাকলে সেটিও জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থ মিনিট: ওষুধের বিষয়ে সতর্ক থাকুন

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সবার জন্য এটি নিরাপদ নয়। অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি, সক্রিয় রক্তক্ষরণ বা চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা থাকলে এটি খাওয়া যাবে না।

যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ও ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ACC/AHA নির্দেশিকায় অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে অ্যাসপিরিন খাওয়ার সিদ্ধান্ত জরুরি সেবাকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া উচিত। ওষুধের জন্য জরুরি চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না। ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়।

পঞ্চম মিনিট: শ্বাস-প্রশ্বাস ও সচেতনতা পর্যবেক্ষণ করুন

আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না এবং সচেতন আছেন কি না, তা খেয়াল করুন। হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে।

এ অবস্থায় দ্রুত জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করে সিপিআর শুরু করুন। আশপাশে কেউ থাকলে তাকে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর (AED) নিয়ে আসতে বলুন। যন্ত্রটির নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং জরুরি সহায়তা না পৌঁছানো পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালিয়ে যান।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী কী?

হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী ভাব, আঁটসাঁট অনুভূতি কিংবা চেপে ধরার মতো ব্যথা। তবে সবার ক্ষেত্রে লক্ষণ এক রকম হয় না।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

  • বুকের মাঝখানে ব্যথা বা চাপ অনুভব করা।
  • ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠে ছড়িয়ে পড়া।
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
  • ঠান্ডা ঘাম হওয়া।
  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
  • মাথা ঘোরা কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা।
  • হঠাৎ তীব্র অস্বস্তি বা বিপদের আশঙ্কা অনুভব করা।

সবার ক্ষেত্রে কি একই লক্ষণ দেখা যায়?

না। অনেকের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকে তীব্র ব্যথা নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমি বমি ভাব কিংবা চোয়াল, পিঠ ও পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

এসব উপসর্গকে অনেকে গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। তাই লক্ষণ নিয়ে সন্দেহ হলেও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে গেলে কী করবেন?

হার্ট অ্যাটাকের পর কেউ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে সেটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের লক্ষণ হতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত জরুরি সেবায় যোগাযোগ করে সিপিআর শুরু করতে হবে।

  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে শক্ত ও সমতল জায়গায় চিত করে শোয়ান।
  • বুকের ঠিক মাঝখানে দুই হাত রেখে জোরে ও দ্রুত চাপ দিন।
  • প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ বার বুকে চাপ দিতে হবে।
  • সম্ভব হলে ৩০ বার চাপের পর দুটি শ্বাস দিন। প্রশিক্ষণ না থাকলে শুধু বুক চাপ দেওয়াও চালিয়ে যান।
  • আশপাশে AED থাকলে সেটি ব্যবহার করুন এবং যন্ত্রের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো বা আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া শুরু না করা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হবে।

হার্ট অ্যাটাকের সময় যেসব ভুল করবেন না

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে—এমন আশায় অপেক্ষা করা যাবে না। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া, ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা কিংবা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করাও বিপজ্জনক।

এ ছাড়া গরম পানীয় পান, বুকে মালিশ, গ্যাসের ওষুধ কিংবা তথাকথিত ‘কাফ সিপিআর’-এর মাধ্যমে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা করার চেষ্টা করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্যের জন্য নির্ধারিত ওষুধও ব্যবহার করা উচিত নয়।

দ্রুত চিকিৎসা কেন জরুরি?

হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী কোনো ধমনিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃদপেশির একটি অংশ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। চিকিৎসা পেতে যত দেরি হয়, হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সাধারণত দ্রুত ইসিজি (ECG) ও প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করা হয়। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী ওষুধ, এনজিওপ্লাস্টি কিংবা স্টেন্ট বসানোর প্রয়োজন হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে এবং হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতি, হার্ট ফেইলিওর ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তাই বুকের ব্যথা বা সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন।

মনে রাখবেন: হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সাহায্য চাওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখা এবং প্রয়োজন হলে সিপিআর শুরু করা জীবন বাঁচাতে পারে।

Advertisements