৩ নভেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
ভ্রমণ

থাইল্যান্ড ভ্রমণে যে ১০টি নিয়ম না মানলে হতে পারে জেল-জরিমানা

images (1)

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড অন্যতম। মনোরম সমুদ্রসৈকত, দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ, বৌদ্ধ মন্দির, সুস্বাদু খাবার ও প্রাণবন্ত রাতের জীবনের আকর্ষণে প্রতিবছর দেশটিতে ভিড় করেন লাখো পর্যটক। বাংলাদেশি ভ্রমণপ্রেমীদের কাছেও দেশটি বেশ জনপ্রিয়।

তবে থাইল্যান্ড ভ্রমণের আগে দেশটির আইন ও স্থানীয় বিধিনিষেধ সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। কারণ, নিজের দেশে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত অনেক কাজ থাইল্যান্ডে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ভিসার মেয়াদ অতিক্রম, নিষিদ্ধ ই-সিগারেট বহন কিংবা মন্দিরে অনুপযুক্ত পোশাক পরার কারণে পড়তে পারেন আইনি জটিলতায়।

সংগৃহীত

তাই থাইল্যান্ডে যাওয়ার আগে পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি নিয়ম জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

১. ভিসা ও অবস্থানের অনুমোদিত সময় অতিক্রম নয়

থাইল্যান্ডে প্রবেশের ভিসার মেয়াদ এবং দেশটিতে থাকার অনুমোদিত সময় এক বিষয় নয়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা পাসপোর্টে যে তারিখ পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি দেবেন, সেটিই চূড়ান্ত।

অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে প্রতিদিন ৫০০ বাথ জরিমানা হতে পারে। এ জরিমানার সর্বোচ্চ পরিমাণ ২০ হাজার বাথ। দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে অবস্থান করলে জরিমানার পাশাপাশি এক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। গ্রেপ্তার হলে আরও কঠোর শাস্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই ভ্রমণের শুরুতেই পাসপোর্টের প্রবেশ সিল ও অবস্থানের শেষ তারিখ যাচাই করুন। মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই আবেদন করুন।

Advertisements

২. কাস্টমসের নিয়ম না জেনে পণ্য বহন করবেন না

থাইল্যান্ডে প্রবেশের সময় ব্যক্তিগত ব্যবহারের পণ্য, অ্যালকোহল, সিগারেট ও বৈদেশিক মুদ্রা বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। সাধারণত ২০ বছরের বেশি বয়সি একজন যাত্রী সর্বোচ্চ এক লিটার অ্যালকোহল এবং ২০০টি সিগারেট অথবা ২৫০ গ্রাম তামাক বহন করতে পারেন।

এ ছাড়া ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা তার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে থাকলে কাস্টমসে ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

মাদক, ই-সিগারেট, অস্ত্র, নকল পণ্য এবং অনুমতি ছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা বুদ্ধমূর্তি বহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত কোনো পণ্য সঙ্গে থাকলে কাস্টমসের নিয়ম অনুসরণ করুন।

৩. ওষুধ বহনের আগে অনুমতি যাচাই করুন

নিজ দেশে বৈধ কোনো ওষুধ থাইল্যান্ডেও বৈধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোডিন, মরফিন, ফেন্টানিল, মেথাডোনসহ কিছু ওষুধ এবং আলপ্রাজোলাম, ডায়াজেপাম ও জোলপিডেমের মতো নির্দিষ্ট ওষুধ বহনে বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে।

ওষুধের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী থাই ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (থাই এফডিএ) অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে।

তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ মূল প্যাকেটে রাখুন। চিকিৎসকের ইংরেজি প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিন এবং ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট ওষুধ বহনের নিয়ম যাচাই করুন। অন্যের জন্য বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ বহন করা থেকে বিরত থাকুন।

৪. পাসপোর্টের কপি ও ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখুন

বিদেশে অবস্থানকালে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পাসপোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি। তবে প্রতিদিন ঘোরাঘুরির সময় মূল পাসপোর্ট সঙ্গে রাখলে হারানো বা চুরির ঝুঁকি থাকে।

এ জন্য পাসপোর্টের তথ্যসংবলিত পাতা, ভিসা ও প্রবেশের সিলের ফটোকপি এবং ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করুন। হোটেলের ঠিকানা ও জরুরি যোগাযোগের নম্বরও ফোনে রাখুন। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণসংক্রান্ত কাজে মূল পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে।

৫. রাজপরিবার নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য করবেন না

থাইল্যান্ডে রাজপরিবারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন গুরুতর অপরাধ। দেশটির ফৌজদারি আইনের ১১২ ধারা অনুযায়ী, রাজা, রানি, উত্তরাধিকারী বা রাজপ্রতিনিধিকে অপমান, মানহানি কিংবা হুমকি দেওয়ার অপরাধে তিন থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট, ছবি বা মন্তব্য করলেও আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি থাই মুদ্রায় থাকা রাজার ছবি পায়ে মাড়ানোও অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তাই রাজপরিবার নিয়ে কটূক্তি, বিতর্কিত মন্তব্য কিংবা অসম্মানজনক কনটেন্ট শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।

৬. মন্দিরে পোশাক ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখুন

থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও স্থানীয়দের জন্য অত্যন্ত পবিত্র স্থান। তাই মন্দিরে প্রবেশের সময় পোশাক ও আচরণের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা পোশাক পরুন। অতিরিক্ত খোলামেলা বা আঁটসাঁট পোশাক এড়িয়ে চলুন। মন্দিরে প্রবেশের আগে জুতা খোলার নিয়ম থাকলে তা মেনে চলুন।

এ ছাড়া বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অসম্মানজনক ভঙ্গিতে ছবি তোলা, মূর্তির ওপর ওঠা কিংবা উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। বসার সময় পায়ের তলা বুদ্ধমূর্তি বা ভিক্ষুদের দিকে রাখবেন না। বিশেষ করে গ্র্যান্ড প্যালেস ও ওয়াট ফ্রা কায়েওতে পোশাকের নিয়ম বেশ কঠোর।

৭. অ্যালকোহল কেনা ও পান করার সময়সীমা জানুন

থাইল্যান্ডে অ্যালকোহল কেনা ও পান করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় এবং স্থানসংক্রান্ত বিধিনিষেধ রয়েছে। সাধারণভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান ও সুপারমার্কেটে সকাল ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অ্যালকোহল কেনা যায়। তবে হোটেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট এলাকা ও অনুমোদিত বিনোদনকেন্দ্রে আলাদা নিয়ম থাকতে পারে।

মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, পেট্রল পাম্প ও নির্দিষ্ট গণপরিবহন এলাকায় অ্যালকোহল পান নিষিদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্মীয় দিবস ও নির্বাচনের সময়ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকা।

৮. ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং ডিভাইস সঙ্গে নেবেন না

থাইল্যান্ডে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্য আমদানি এবং বহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভ্যাপ পেন, ডিসপোজেবল ই-সিগারেট, ই-লিকুইড, পড ও হিটেড টোব্যাকো ডিভাইসও এ বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে পারে।

এসব পণ্য বহন বা আমদানির ক্ষেত্রে জব্দ, জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হলেও ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং ডিভাইস থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

৯. গাঁজা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন

২০২২ সালে গাঁজার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার পর অনেকের ধারণা হয়েছিল, থাইল্যান্ডে অবাধে গাঁজা ব্যবহার করা যায়। তবে পরবর্তী সময়ে দেশটির নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৫ সালে চিকিৎসাভিত্তিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসার প্রয়োজনে গাঁজা ব্যবহার করতে থাইল্যান্ডের অনুমোদিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া গাঁজা কেনা, বহন বা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জনসমক্ষে গাঁজা সেবনের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে।

নিজ দেশ থেকে গাঁজা বা গাঁজাজাত পণ্য নিয়ে থাইল্যান্ডে প্রবেশ করাও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

১০. নির্দিষ্ট সমুদ্রসৈকতে ধূমপান করবেন না

থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় অনেক সমুদ্রসৈকতে পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফুকেটের পাটং, কাটা ও কারন; পাতায়ার বিচ ও জোমতিয়েন; কোহ সামুইয়ের চাওয়েং ও বোফুটসহ বিভিন্ন সৈকতের নির্দিষ্ট এলাকায় ধূমপান নিষিদ্ধ।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক লাখ বাথ জরিমানা, এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা উভয় শাস্তি হতে পারে। কিছু সৈকতে নির্দিষ্ট ধূমপান অঞ্চল থাকলেও সেখানে যাওয়ার আগে স্থানীয় নির্দেশনা দেখে নিন। বালুতে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলাও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

ভ্রমণের আগে যেসব প্রস্তুতি নেবেন

থাইল্যান্ড ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে যাত্রার আগেই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করুন। পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ যাচাই করুন। অবস্থানের শেষ অনুমোদিত তারিখ জেনে নিন। প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও অনুমতি সঙ্গে রাখুন। কাস্টমসের নিয়ম মেনে পণ্য ও নগদ অর্থ বহন করুন। পাশাপাশি মন্দিরে পরার উপযোগী পোশাক এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখুন।

থাইল্যান্ড ভ্রমণ হতে পারে দারুণ অভিজ্ঞতা। তবে বিদেশে গেলে নিজের দেশের নিয়ম নয়, গন্তব্য দেশের আইন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করাই সবচেয়ে জরুরি। আগে থেকে বিধিনিষেধ সম্পর্কে সচেতন থাকলে অপ্রত্যাশিত জরিমানা ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যাবে ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত।

Advertisements