জনবল ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটে দাউদকান্দির পরিবার পরিকল্পনা সেবা

পরিকল্পিত পরিবার গঠন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। কিন্তু কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় এ কার্যক্রম এখন নানা সংকটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাব, অন্যদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে অনেককেই খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮৭ জন। অর্থাৎ ৭২টি পদই শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৪৫ শতাংশ। জনবল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে দম্পতিদের সচেতন করা, পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে একজন থাকার কথা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাপ্তরিক কাজে অধিকাংশ সময় ঢাকার সদর দপ্তরে অবস্থান করেন। সহকারী মেডিকেল কল্যাণ কর্মকর্তা পদে দুজনের মধ্যে একজনকে হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ ছাড়া মেডিকেল অফিসার (পরিবারকল্যাণ) পদে অনুমোদিত তিনটি পদের বিপরীতে কেউ কর্মরত নেই। ফার্মাসিস্টের তিনটি পদও শূন্য।
মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। স্যাকমো পদে ছয়জন, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদে ১১ জন, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (এফপিআই) পদে একজন, পরিবারকল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) পদে ২৭ জনসহ বিভিন্ন পদে জনবল নেই। পাশাপাশি এমএলএস ও নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া, দাইনার্স এবং চালকের পদও শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক কর্মী দিয়ে পুরো উপজেলার সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
শুধু জনবল নয়, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সাধারণত কনডম, খাবার বড়ি, ইনজেকশন, আইইউডি বা কপার-টি এবং ইমপ্ল্যান্টের মতো বিভিন্ন পদ্ধতির সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। কিন্তু দাউদকান্দিতে এসব সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় সেবাগ্রহীতারা নিজেদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বেছে নিতে পারছেন না। বিশেষ করে কনডম ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতির সেবা দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী নিতে এসে অনেক সময় তা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। বিষয়টি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতেও অস্বস্তি বোধ করেন।
কার্যালয়ের স্টোরের দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী শাখাওয়াত হোসেনও সামগ্রীর সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পরিস্থিতি চলছে। মেরি স্টোপসের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণে আইইউডি বা কপার-টি সংগ্রহ করে জরুরি প্রয়োজনে সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে সরবরাহের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ কারণে অনেক সময় সেবাগ্রহীতারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অফিস সহকারী ফারুক হোসেন বলেন, ১৫৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৭২টি শূন্য থাকায় মাত্র ৮৭ জন কর্মী দিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে পুরো উপজেলার কার্যক্রম পরিচালনা করতে তাঁদের যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান মানিক জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে এসব সামগ্রী সরবরাহ করা হতো। ২০২৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি। ফলে সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেলে আগের মতো সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। জনবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে গেছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগ নিয়ে মামলা চলমান থাকায় এ পদেও নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম কার্যকর রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিনা মূল্যে এসব সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিই বাড়বে না, পরিকল্পিত পরিবার গঠন, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দাউদকান্দির এই পরিস্থিতি তাই কেবল একটি কার্যালয়ের প্রশাসনিক সংকট নয়; বরং মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।



