২ নভেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

অজান্তেই বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি? সুস্থ থাকতে খান এই ৮ খাবার

1791447780_liver-lead-jpg-9

অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের কারণে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। শুধু বেশি বয়সীদের নয়, তরুণদের মধ্যেও এ রোগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শুরুতে অনেক সময় তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু দীর্ঘদিন যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমে থাকলে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কিছু ক্ষেত্রে তা লিভার সিরোসিসসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশ্বজুড়ে যকৃতের রোগের অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ফ্যাটি লিভার। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জীবনযাপনের ধরন ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন না এলে ভবিষ্যতে এ সমস্যার প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

ছবি:সংগৃহীত

বাংলাদেশে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা মদ্যপানজনিত নয় এমন ফ্যাটি লিভারের ঘটনা বেশি দেখা যায়। স্থূলতা, ডায়াবেটিস, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল কম থাকা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এ সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট ও চর্বি গ্রহণ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে ওজন কমানো, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট কোনো খাবার একা এ রোগ সারিয়ে দিতে পারে না। তবে কিছু পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখলে যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং বিপাকীয় ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

১. সবুজ শাকসবজি

পালংশাক, লেটুসসহ বিভিন্ন সবুজ পাতাওয়ালা সবজিতে রয়েছে আঁশ, পলিফেনল, নাইট্রেট ও নানা ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। গবেষণায় সবুজ শাকসবজি গ্রহণের সঙ্গে যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি কমার সম্পর্কও দেখা গেছে। তাই প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখা ভালো। সালাদ হিসেবে কাঁচা বা উপযুক্তভাবে রান্না করে এগুলো খাওয়া যেতে পারে।

Advertisements
ছবি:সংগৃহীত

২. ডাল, ছোলা ও বীজজাতীয় খাবার

মসুর ডাল, মটরশুঁটি, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবারে প্রচুর আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। এগুলো দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে এবং রক্তে চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। সয়াবিন ও টফুও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস। পাশাপাশি সূর্যমুখীর বীজে থাকা ভিটামিন ই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

৩. সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ

ইলিশ, টুনা, স্যামন ও সার্ডিনের মতো তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে এবং শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্যতালিকায় মাছ রাখা উপকারী। সপ্তাহে কয়েক দিন মাছ খাওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। তবে মাছ রান্নার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল ও ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলা ভালো।

৪. ওটস ও পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার

পরিশোধিত শর্করার পরিবর্তে আঁশসমৃদ্ধ জটিল শর্করা বেছে নেওয়া ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ওটস, লাল আটার রুটি, যব ও অন্যান্য পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার এ ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প। এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দীর্ঘ সময় ক্ষুধা কম অনুভব করতে সাহায্য করে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও সুবিধা হয়।

৫. আখরোট

ছবি:সংগৃহীত

আখরোটে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। এগুলো হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আখরোটে থাকা আরজিনিন শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। পরিমিত পরিমাণে আখরোট খাওয়া যেতে পারে। তবে এটি ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা নয়; বরং সুষম খাদ্যতালিকার একটি অংশ।

৬. বিট

বিটে রয়েছে আঁশ, নাইট্রেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। বিটে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখতে পারে। সালাদ, সেদ্ধ বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর উপায়ে বিট খাওয়া যায়।

৭. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল

লেবু, পেয়ারা ও আমলকির মতো ফলে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। এটি শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মৌসুমি ফল রাখা ভালো। তবে ফলের রসের পরিবর্তে আস্ত ফল খাওয়াই বেশি উপকারী, কারণ এতে আঁশও পাওয়া যায়। অতিরিক্ত চিনি মেশানো ফলের পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত।

৮. হলুদ ও রসুন

রান্নায় ব্যবহৃত হলুদ ও রসুনেও রয়েছে উপকারী কিছু প্রাকৃতিক উপাদান। হলুদের কারকিউমিন এবং রসুনের বিভিন্ন সালফারজাত যৌগ নিয়ে প্রদাহ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর গবেষণা হয়েছে। তবে এগুলো ফ্যাটি লিভার সারানোর প্রমাণিত চিকিৎসা নয়। স্বাভাবিক রান্নার অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে হলুদ ও রসুন খাওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো উপাদানের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

ছবি:সংগৃহীত

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে শুধু কিছু নির্দিষ্ট খাবার খেলেই হবে না; সামগ্রিক জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাও জরুরি। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে তা কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা এবং ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

যাঁদের ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের সমন্বয়ই যকৃতের সুস্থতা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Advertisements