৩১ অক্টোবর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

জ্বর কমলেই অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ? অজান্তেই ডেকে আনছেন বড় বিপদ!

IMG_7abf4814-2455-4049-8c42-bb3cf7591b88

জ্বর কমেছে, শরীরের অস্বস্তিও অনেকটা কেটে গেছে। তাই কয়েক দিন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর অনেকেই বাকি ওষুধ আর সেবন করেন না। তাঁদের ধারণা, উপসর্গ চলে গেলে ওষুধেরও আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কখনো কখনো সংক্রমণ ফিরে আসা এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের চিকিৎসা কত দিন চলবে, তা সংক্রমণের ধরন, ব্যবহৃত ওষুধ ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

উপসর্গ কমলেই কি সংক্রমণ সেরে যায়?

অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর জ্বর, ব্যথা কিংবা অন্যান্য উপসর্গ কমে আসা মানেই সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এমন নয়। কিছু ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ কমে গেলেও সংক্রমণ থেকে যেতে পারে। আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই ওষুধ বন্ধ করলে সংক্রমণ ফিরে আসার আশঙ্কাও থাকে।

তবে সব অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। চিকিৎসক সংক্রমণের ধরন অনুযায়ী যত দিনের জন্য ওষুধ দেন, সেই নির্দেশনা মেনে চলাই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা কিংবা চিকিৎসার মেয়াদ বাড়ানো—কোনোটিই নিরাপদ নয়।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি

অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ব্যাকটেরিয়া যখন কোনো ওষুধের প্রভাব এড়িয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে, তখন তাকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা বলা হয়। এর ফলে প্রচলিত ওষুধে সংক্রমণ সারানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প ওষুধের প্রয়োজন হয়, চিকিৎসার খরচ বাড়ে এবং হাসপাতালে দীর্ঘ সময় থাকতে হতে পারে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স মাঝপথে বন্ধ করলেই যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হবে, তা নয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম বা ভুলভাবে ওষুধ গ্রহণ, অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ নানা বিষয় এ সমস্যার সঙ্গে জড়িত। তাই সঠিক ওষুধ, উপযুক্ত মাত্রা এবং চিকিৎসকের নির্ধারিত মেয়াদ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements

সর্দি-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিক কেন নয়?

সাধারণ সর্দি-কাশি, ফ্লু ও অধিকাংশ ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। কারণ, এসব ওষুধ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। অথচ অনেকেই সামান্য জ্বর কিংবা গলাব্যথা হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন শুরু করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার বাড়ে এবং ভবিষ্যতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা জটিল হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়া, আগের অসুখে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক আবার গ্রহণ করা কিংবা ফার্মেসির পরামর্শে নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ শুরু করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

ব্যক্তিগত অসচেতনতা থেকে বৈশ্বিক সংকট

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা শুধু একজন রোগীর সমস্যা নয়। প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পশুপাখির চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এ সংকটকে জটিল করে তোলে।

ফলে মূত্রনালির সংক্রমণ, নিউমোনিয়া কিংবা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসায় কার্যকর ওষুধের বিকল্প সীমিত হয়ে পড়তে পারে। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা কিংবা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো চিকিৎসাব্যবস্থাও কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরশীল।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম দায়িত্ব ব্যক্তির। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করতে হবে। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কিংবা ওষুধ খেতে সমস্যা হলে নিজে থেকে বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেবেন।

পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর্মী ও ফার্মাসিস্টদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণিসম্পদে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কিন্তু এর কার্যকারিতা চিরস্থায়ী নয়। আজকের অসচেতন ব্যবহার আগামী দিনের চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই উপসর্গ কমে যাওয়ার পর নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Advertisements