২ নভেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
নারী

দুই হাত অচল, পা দিয়েই এইচএসসি পাস কলির স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া

Rangpur disabled girl-01

জন্ম থেকেই দুটি হাত অচল। তবু থেমে থাকেনি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের গদাই গ্রামের কলি রানীর পথচলা। দুই পা-কে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলে পড়াশোনা, ছবি আঁকা, গান গাওয়া, এমনকি কম্পিউটার ও মোবাইল ব্যবহারের দক্ষতাও অর্জন করেছেন তিনি। এবার পা দিয়ে লিখেই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন এই অদম্য তরুণী। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

কাউনিয়া মহিলা কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী কলি এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৫০ পেয়েছেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর কাছে কখনো স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন তিনি। কলির বিশ্বাস, মানুষের প্রকৃত শক্তি শরীরের সক্ষমতায় নয়, বরং মনের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসে।

তবে তাঁর এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। কলি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখনই বাবাকে হারান। কৃষক মনোরঞ্জন রায়ের মৃত্যুর পর ছয় ভাই-বোনের পরিবারে নেমে আসে আর্থিক অনিশ্চয়তা। সংসারের সবার ছোট কলিকে নিয়ে মা রুপালী রানীর জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একদিকে মেয়ের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে সীমিত আয়ের সংসার—সবকিছু সামলে সন্তানদের বড় করে তোলার দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে।

পরিবারের সামান্য কৃষিজমিই ছিল আয়ের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু তিস্তা নদীর ভাঙনে সেই জমিরও বড় একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট জমিতে চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসার চলে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কলির পড়াশোনা ও স্বপ্নের প্রতি আগ্রহ কমেনি। শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কাজেও নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন কলি। ভাওয়াইয়া ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পেয়েছেন ডজনখানেক পুরস্কার। দুই পা দিয়ে ছবি এঁকেও অর্জন করেছেন একাধিক সম্মাননা। তাঁর সাহস, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের কারণে স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘হার না মানা তরুণী’ হিসেবে।

কলির মা রুপালী রানী জানান, জন্ম থেকেই মেয়ের দুটি হাত অচল। তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে পা দিয়ে দৈনন্দিন কাজ শেখানো হয়েছে। দীর্ঘ অনুশীলন ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কলি দুই পা দিয়েই প্রায় সব কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। পা দিয়ে লেখাপড়া করা, খাওয়া, গোসল, চুল আঁচড়ানো থেকে শুরু করে মোবাইল ও কম্পিউটার চালানো—সবই করতে পারেন তিনি। শুধু নিজের পোশাক পরার ক্ষেত্রে মায়ের সাহায্য প্রয়োজন হয়।

মেয়ের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন রুপালী রানী। তিনি বলেন, কলি কখনো নিজের ভাগ্য নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেনি। তাঁর স্বপ্ন বিসিএস পাস করে মানুষের জন্য কাজ করা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। স্বামী বেঁচে থাকলে হয়তো মেয়ের পাশে আরও ভালোভাবে দাঁড়াতে পারতেন। কৃষিকাজের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তবু মেয়ের স্বপ্ন পূরণে যতটা সম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।

Advertisements

কলির বড় ভাই মন্টু রায় জানান, ছোটবেলায় ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখার অভ্যাস তৈরি করেছিল কলি। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে এখন সে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো দ্রুত লিখতে পারে। পরিবারের আর্থিক সংকট ও তিস্তার ভাঙনে জমি হারানোর পরও বোনের পড়াশোনা বন্ধ হতে দিতে চান না তাঁরা। যত কষ্টই হোক, তার শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।

নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক ও সহপাঠীদের অবদানের কথাও তুলে ধরেছেন কলি। তাঁর ভাষায়, মা তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। ভাই, পরিবারের অন্য সদস্য, শিক্ষক ও সহপাঠীদের উৎসাহ এবং ভালোবাসা তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।

নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই জানিয়ে কলি বলেন, তাঁর দুই পা-ই তাঁর হাত, তাঁর শক্তি। এই পায়ের ওপর ভর করেই জীবনের সব বাধা পেরিয়ে যেতে চান তিনি। স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থেমে না যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন এই তরুণী।

কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলির অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে জিপিএ-৩.৫০ অর্জন করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীতচর্চা, চিত্রাঙ্কন ও কম্পিউটার শিক্ষায়ও নিজেকে দক্ষ করে তুলেছে। তাঁর মতে, কলির জীবন ও অধ্যবসায় অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে কলি যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তা কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়। বরং নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রেখে স্বপ্নের পথে অবিচল থাকার এক অনন্য উদাহরণ। এখন তাঁর চোখ বিসিএসের স্বপ্নে; সেই স্বপ্ন পূরণ করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের পরবর্তী লক্ষ্য।

Advertisements