শীতের সকালে ব্যায়ামের আগে কোন পানীয় পান করবেন?

শীতের সকালে বিছানার আরাম ছেড়ে শরীরচর্চা শুরু করা অনেকের জন্যই বেশ কঠিন। তবে নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি শরীরের শক্তি ও পানির ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যায়াম শুরুর আগে কী খাচ্ছেন বা পান করছেন, তার ওপর শরীরের কর্মক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করতে পারে। এ কারণে অনেকেই ব্যায়ামের আগে ক্যাফেইনযুক্ত প্রি-ওয়ার্কআউট সাপ্লিমেন্ট পান করেন। তবে এসব সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে ঘরে থাকা পরিচিত কিছু উপাদান দিয়েও পুষ্টিকর পানীয় তৈরি করা সম্ভব।
কলা, দুধ, ওটস, ডাবের পানি, বিটরুট কিংবা কমলার মতো উপাদান দিয়ে তৈরি পানীয় শরীরে তরল ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। ব্যায়ামের ধরন, সময় এবং শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী এসব পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে। শীতের সকালে শরীরচর্চার আগে পান করতে পারেন এমন সাতটি পানীয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
১. হালকা গরম লেবুপানি

শীতের সকালে ঠান্ডা পানি পান করতে অনেকেরই অনীহা থাকে। এ ক্ষেত্রে এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। এটি শরীরে পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে এবং সকালে সতেজ অনুভূতি দিতে পারে। বিশেষ করে যারা ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করতে যান, তাদের জন্য এটি সহজ একটি বিকল্প।
এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে অর্ধেক লেবুর রস মিশিয়ে তৈরি করতে পারেন এই পানীয়। ব্যায়াম শুরুর ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে এটি পান করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, লেবুপানি সরাসরি শরীরে অতিরিক্ত শক্তি জোগায় না কিংবা চর্বি গলানোর কোনো বিশেষ উপায় নয়। এটি মূলত শরীরকে আর্দ্র রাখতে সহায়ক একটি পানীয়। যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তাদের লেবুর পরিমাণের বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।
২. কলার স্মুদি

ব্যায়ামের আগে শরীরে শক্তি জোগাতে কলার স্মুদি ভালো একটি বিকল্প হতে পারে। কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, দুধে রয়েছে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট, যা ব্যায়ামের আগে পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে।
একটি পাকা কলার সঙ্গে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিলিটার দুধ মিশিয়ে ব্লেন্ড করলেই তৈরি হয়ে যাবে কলার স্মুদি। প্রয়োজন হলে সামান্য পানি যোগ করা যায়। অতিরিক্ত চিনি বা সিরাপ ব্যবহার না করাই ভালো। ব্যায়াম শুরুর প্রায় ৬০ থেকে ৯০ মিনিট আগে এটি পান করতে পারেন। তবে ব্যায়ামের আগে হাতে কম সময় থাকলে পুরো এক গ্লাস স্মুদি না খেয়ে একটি কলা অথবা অল্প পরিমাণ স্মুদি গ্রহণ করা যেতে পারে। দুধ হজমে সমস্যা হলে ল্যাকটোজমুক্ত দুধ ব্যবহার করা ভালো।
৩. ডাবের পানি

শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে ডাবের পানি বেশ পরিচিত একটি প্রাকৃতিক পানীয়। এতে পটাশিয়ামসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট রয়েছে। শীতকালে শরীরচর্চার আগে হালকা ও সতেজ পানীয় হিসেবে এটি পান করা যেতে পারে।
ব্যায়াম শুরুর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে এক ছোট গ্লাস ডাবের পানি পান করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ডাবের পানিতে সোডিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলক কম। ফলে দীর্ঘ সময়ের কঠোর ব্যায়ামে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে যে পরিমাণ ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়, তা পূরণে শুধু ডাবের পানি যথেষ্ট নাও হতে পারে। সাধারণ বা মাঝারি ব্যায়ামের ক্ষেত্রে অবশ্য পানি পান করাই অনেক সময় যথেষ্ট। কিডনির সমস্যা থাকলে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে পটাশিয়াম গ্রহণ সীমিত রাখতে হলে ডাবের পানি পানের আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
৪. ওটস ও দুধের স্মুদি

যারা সকালে ব্যায়ামের আগে কিছুটা পেট ভরা রাখতে চান, তাদের জন্য ওটস ও দুধের স্মুদি উপযোগী হতে পারে। ওটসে থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরে শক্তি সরবরাহ করে। পাশাপাশি এতে রয়েছে খাদ্যতন্তু, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। দুধ যোগ করলে এতে প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও যুক্ত হয়।
এই স্মুদি তৈরি করতে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম ওটসের সঙ্গে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিলিটার দুধ মিশিয়ে ব্লেন্ড করতে হবে। স্বাদ বাড়ানোর জন্য অর্ধেক কলা যোগ করা যেতে পারে। ব্যায়াম শুরুর অন্তত ৬০ থেকে ১২০ মিনিট আগে এটি পান করা ভালো। কারণ, ওটসে থাকা খাদ্যতন্তু হজম হতে কিছুটা সময় নেয়। তাই দৌড়ানো বা কঠোর ব্যায়ামের ঠিক আগে বেশি পরিমাণে ওটসের স্মুদি পান করলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
৫. বিটরুটের রস

ব্যায়ামের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাব্য প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে বিটরুটের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে থাকা নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালির কার্যক্রম ও রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বিটরুটের রস গ্রহণ করলে কিছু ধরনের ব্যায়ামে কর্মক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে এর ফলাফল সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না।
একটি ছোট বিটরুট ভালোভাবে ধুয়ে কেটে পানির সঙ্গে ব্লেন্ড করে রস তৈরি করা যায়। চাইলে সামান্য লেবুর রস মেশানো যেতে পারে। সাধারণত ব্যায়াম শুরুর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে বিটরুটের রস গ্রহণের বিষয়ে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা পানীয়তে থাকা নাইট্রেটের পরিমাণের ওপরও নির্ভর করে। যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের নিয়মিত বিটরুটের রস পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. পানির সঙ্গে কমলার রস

শীতকালে কমলা সহজলভ্য একটি ফল। এতে রয়েছে ভিটামিন সি এবং প্রাকৃতিক শর্করা। কমলার রসের সঙ্গে পানি মিশিয়ে পান করলে শরীরে তরল ও কিছু কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করা সম্ভব। বিশেষ করে সকালে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ব্যায়াম করতে গেলে এই পানীয় থেকে কিছুটা শক্তি পাওয়া যেতে পারে।
এটি তৈরি করতে আধা গ্লাস তাজা কমলার রসের সঙ্গে সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে নিতে পারেন। স্বাদ অনুযায়ী পানির পরিমাণ বাড়ানো যাবে। ব্যায়াম শুরুর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে পান করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আস্ত কমলার তুলনায় ছেঁকে নেওয়া রসে খাদ্যতন্তু কম থাকে এবং প্রাকৃতিক শর্করার ঘনত্ব বেশি হতে পারে। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
৭. গরম দুধ ও কলা

শীতের সকালে ঠান্ডা পানীয়ের পরিবর্তে উষ্ণ কিছু পান করতে চাইলে দুধ ও কলার মিশ্রণ বেছে নিতে পারেন। দুধে থাকা প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি কলা থেকে পাওয়া যায় বাড়তি কার্বোহাইড্রেট। ফলে এটি ব্যায়ামের আগে হালকা খাবার বা পানীয় হিসেবে কাজ করতে পারে।
এক কাপ হালকা গরম দুধের সঙ্গে অর্ধেক বা একটি ছোট কলা খেতে পারেন। চাইলে কলাটি আলাদাভাবেও খাওয়া যায়। অতিরিক্ত চিনি বা মধু যোগ করার প্রয়োজন নেই। ব্যায়ামের আগে এটি গ্রহণ করলে অন্তত ৪৫ থেকে ৯০ মিনিট বিরতি রাখা ভালো। তবে দুধ খাওয়ার পর পেটে ভারী ভাব বা অস্বস্তি হলে বিকল্প খাবার বেছে নেওয়া উচিত।
শরীরচর্চার আগে কোন পানীয় পান করবেন, তা নির্ভর করে ব্যায়ামের সময়কাল, তীব্রতা এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণত এক ঘণ্টার কম সময়ের মাঝারি ধরনের ব্যায়ামের জন্য সাধারণ পানিই যথেষ্ট। তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ব্যায়ামের আগে কলা বা অল্প পরিমাণ স্মুদি থেকে প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময়ের কঠোর ব্যায়ামে শরীরের তরল, কার্বোহাইড্রেট ও ইলেকট্রোলাইটের চাহিদা বিবেচনা করতে হয়।
শীতকালে তৃষ্ণার অনুভূতি তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু এ সময়ও শরীরের পানির প্রয়োজন কমে যায় না। তাই ব্যায়ামের আগে, ব্যায়ামের সময় এবং পরেও প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে।
প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি পানীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক হলেও সব পানীয় সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে পানীয় নির্বাচনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সঠিক পানীয় বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যায়ামের আগে ওয়ার্ম-আপ করা এবং শীতের উপযোগী পোশাক পরাও শরীরচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



