নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, বাড়ছে হাড় দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা

শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নীরবে বাড়িয়ে দিচ্ছে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকেই বিষয়টিকে সাধারণ ক্লান্তি কিংবা কাজের চাপ বলে মনে করছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শনাক্ত হচ্ছে দেরিতে। এতে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ও শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন এ ঘাটতি অনির্ণীত থাকলে শিশুদের রিকেটস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অস্টিওম্যালেশিয়া হতে পারে। এসব রোগে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায় এবং হাড় বিকৃত হওয়া কিংবা সহজে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ভিটামিন ডি-এর প্রধান প্রাকৃতিক উৎস সূর্যের আলো। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের সংস্পর্শে এলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তবে আধুনিক নগরজীবন, দীর্ঘ সময় ঘরে বা অফিসে থাকা, নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং শরীর ঢেকে পোশাক পরার কারণে সূর্যের আলো থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
এ ছাড়া ত্বকের গাঢ় রঙের মানুষের শরীরে মেলানিনের পরিমাণ বেশি থাকায় ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর হতে পারে। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরিতে বেশি সময় সূর্যের আলো প্রয়োজন হতে পারে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট শরীরের কিছু অংশে সরাসরি সূর্যের আলো লাগানো যেতে পারে। তবে ত্বকের ধরন, আবহাওয়া ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সময় ভিন্ন হতে পারে।
খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ইলিশ, স্যামন ও ম্যাকেরেলের মতো তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, গরুর কলিজা এবং অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসা নির্দিষ্ট ধরনের মাশরুম উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ দুধ, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাঁদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে শুধু খাবারের মাধ্যমে স্বাভাবিক মাত্রা ফিরিয়ে আনা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এ জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ডি৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। ঘাটতির মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করেন। তবে পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত নয়।
গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁরা শারীরিক কারণে নিয়মিত বাইরে যেতে পারেন না, তাঁদের ভিটামিন ডি-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যে ভিটামিন ডি যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আটা, ময়দা ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধকরণ করা হলে সাধারণ মানুষের ঘাটতি মোকাবিলা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি প্রতিরোধে সচেতনতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূরক গ্রহণ জরুরি। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক—সব বয়সী মানুষের হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।



