২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

ইস্কেমিক স্ট্রোকের পর রোগী কতটা সুস্থ হতে পারেন?

1730195575_900600-for-article-12

স্ট্রোকের কথা শুনলে অনেকেই হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেন। তবে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন শারীরিক সমস্যা। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, আর স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যাজনিত একটি গুরুতর অবস্থা। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে।

রক্তনালি বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে যে স্ট্রোক হয়, তাকে বলা হয় ইস্কেমিক স্ট্রোক। অন্যদিকে, মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে সেটি হেমোরেজিক স্ট্রোক হিসেবে পরিচিত। দুই ধরনের স্ট্রোকই জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে। বিশেষ করে ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানোর এবং রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমেই যা করবেন

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিতে হবে। রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেওয়া উচিত নয়।

লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, তা মনে রাখা বা লিখে রাখা প্রয়োজন। সঠিক সময় জানা না থাকলে রোগীকে সর্বশেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল, সেই সময়টি চিকিৎসককে জানাতে হবে। কারণ, স্ট্রোকের চিকিৎসা নির্ধারণে সময়ের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রোগীকে পানি, খাবার কিংবা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়ার আগে সতর্ক থাকতে হবে। স্ট্রোকের কারণে গিলতে সমস্যা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়। কারণ, সব স্ট্রোক রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণে ঘটে না; কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়, যেখানে চিকিৎসার পদ্ধতি ভিন্ন।

Advertisements

লক্ষণ কমে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না

স্ট্রোকের মতো লক্ষণ দেখা দেওয়ার কিছুক্ষণ পর রোগী আবার স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন কিংবা হাত-পায়ের দুর্বলতা কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, সমস্যা হয়তো নিজে থেকেই সেরে গেছে। কিন্তু লক্ষণ কমে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে গেছে, এমন নয়।

এ ধরনের ঘটনা ক্ষণস্থায়ী ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ-এর লক্ষণ হতে পারে। এতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং কিছু সময় পর লক্ষণ চলে যেতে পারে। তবে টিআইএ ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকির সংকেত হতে পারে। বাড়িতে বসে শুধু লক্ষণ দেখে টিআইএ ও পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব নয়। তাই লক্ষণ সেরে গেলেও দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া জরুরি।

দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করান। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করা এবং রক্তনালি বন্ধ হয়েছে নাকি রক্তক্ষরণ ঘটেছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। কারণ, দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসা এক নয়।

ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে রক্তের জমাট ভাঙার ওষুধ প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তনালি থেকে জমাট রক্ত অপসারণের সুযোগও থাকে। তবে কোন রোগী কোন চিকিৎসা পাবেন, তা নির্ভর করে লক্ষণ শুরুর সময়, মস্তিষ্কের ক্ষতির ধরন, পরীক্ষার ফলাফল এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর।

লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে বলে হাসপাতালে যাওয়া থেকে বিরত থাকা ঠিক নয়। নির্দিষ্ট চিকিৎসার সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও রোগীর জরুরি মূল্যায়ন, জটিলতা নিয়ন্ত্রণ এবং পরবর্তী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই বাড়িতে অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

ইস্কেমিক স্ট্রোকের পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা কতটা?

স্ট্রোক হওয়ার পর রোগী কতটা সুস্থ হয়ে উঠবেন, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। মস্তিষ্কের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে, কতটা ক্ষতি হয়েছে, চিকিৎসা কত দ্রুত শুরু করা গেছে এবং রোগীর আগে থেকে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল কি না—এসব বিষয় সুস্থতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু রোগী চিকিৎসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দৈনন্দিন কাজে ফিরতে পারেন। আবার কারও ক্ষেত্রে হাঁটাচলা, হাতের ব্যবহার, কথা বলা কিংবা নিজের প্রয়োজনীয় কাজ করার সক্ষমতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। গুরুতর স্ট্রোকের পর কারও কারও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতাও থেকে যেতে পারে।

তাই সবার জন্য সুস্থ হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো হার বা সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। রোগীর অবস্থা, মস্তিষ্কের ক্ষতির মাত্রা এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ওপর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ভিন্ন হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা ও নিয়মিত পুনর্বাসন অনেক রোগীর সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। তবে চিকিৎসার পর কতটা উন্নতি হবে, তা নিয়ে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকে।

পুনর্বাসন সুস্থতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ

স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসার পর রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে পুনর্বাসন শুরু করা হয়। এর লক্ষ্য শুধু রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং তার দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জীবনযাত্রার মান যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা।

রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ, কথা বলা ও গিলতে পারার সমস্যা দূর করার থেরাপি এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া হতে পারে। কারও হাঁটাচলায় সমস্যা হলে তাকে নিরাপদে চলাফেরা শেখানো হয়। আবার কারও কথা বলতে বা নিজের প্রয়োজন বোঝাতে অসুবিধা হলে ভাষা ও যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে।

পুনর্বাসনের ফল পেতে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। কারও উন্নতি দ্রুত হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে অনুশীলন চালিয়ে যেতে হয়। রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসক ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলা প্রয়োজন।

Advertisements