পুরুষের তুলনায় নারীর শরীরে দ্বিগুণ আয়রন কেন প্রয়োজন?

নারীর সুস্থতা, কর্মক্ষমতা ও শরীরে রক্তের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে আয়রনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দৈনন্দিন ব্যস্ততায় অনেক নারীই শরীরে এই খনিজ উপাদানের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করার বিষয়টি উপেক্ষা করেন। মাসিকের সময় নিয়মিত রক্তক্ষয়, গর্ভাবস্থায় শিশুর বেড়ে ওঠা এবং সন্তান জন্মদানের মতো শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের কারণে নারীদের শরীরে আয়রনের চাহিদা পুরুষের তুলনায় বেশি হয়। বিশেষ করে প্রজননক্ষম বয়সে নারীদের আয়রনের ঘাটতিতে ভোগার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের দৈনিক প্রায় ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন প্রয়োজন। একই বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এ চাহিদা প্রায় ৮ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ প্রজননক্ষম বয়সে নারীদের দৈনিক আয়রনের প্রয়োজন পুরুষের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
মাসিকের রক্তক্ষয় বাড়ায় ঘাটতির ঝুঁকি
নারীদের আয়রনের চাহিদা বেশি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ মাসিক। প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যায়। রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে আয়রন প্রয়োজন হওয়ায় এই রক্তক্ষয়ের সঙ্গে শরীরের আয়রনও কমে যায়। যেসব নারীর মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি আরও বেশি। আয়রনের অভাব হলে শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
গর্ভাবস্থায় চাহিদা বেড়ে যায়
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে আয়রনের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। এ সময় মায়ের রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অতিরিক্ত আয়রন দরকার হয়।গর্ভাবস্থায় দৈনিক আয়রনের প্রস্তাবিত চাহিদা প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম। সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় রক্তক্ষরণ হলেও শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রসবের আগে ও পরে মায়ের পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় আয়রনের চাহিদা অবশ্যই একই হারে বাড়ে, এমন নয়; এ ক্ষেত্রে মায়ের বয়স, প্রসবের পর মাসিক ফিরে আসা এবং শারীরিক অবস্থার ওপর প্রয়োজন নির্ভর করে।
হরমোন ও শারীরিক পরিবর্তনের প্রভাব
নারীর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে মাসিক, গর্ভধারণ ও প্রসবের মতো শারীরবৃত্তীয় ঘটনা যুক্ত থাকে। এসব পরিবর্তন আয়রনের প্রয়োজনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে হরমোনের পরিবর্তন একাই নারীদের বেশি আয়রন প্রয়োজন হওয়ার প্রধান কারণ নয়; নিয়মিত মাসিকের রক্তক্ষয়ই এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।
বয়সভেদে আয়রনের চাহিদা
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক আয়রনের প্রয়োজন প্রায় ৮ মিলিগ্রাম। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রয়োজন ১৮ মিলিগ্রাম এবং গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজন প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম। অন্যদিকে, ৫১ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের দৈনিক চাহিদা সাধারণত ৮ মিলিগ্রাম। মেনোপজের পর মাসিকজনিত রক্তক্ষয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আয়রনের প্রয়োজন কমে আসে।
খাবারেই মিলতে পারে প্রয়োজনীয় আয়রন
আয়রনের ঘাটতি প্রতিরোধে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা জরুরি। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, ছোলা, শিমজাতীয় খাবার এবং গাঢ় সবুজ শাকসবজি আয়রনের ভালো উৎস। উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাওয়া আয়রন শরীরে শোষণে সহায়তা করতে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন পেয়ারা, লেবু বা কমলা খাওয়া যেতে পারে।
তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয়রন গ্রহণও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রনের বড়ি বা সম্পূরক গ্রহণ করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকলে নিজে থেকে আয়রন খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করানোই ভালো।



