তিন বোনের ডেঙ্গু, দুই বোন ফিরল ঘরে- ফিরল না বাবার ‘ফাইটার’ আরোশী

আইসিইউতে শুয়ে থাকা মেয়েকে সাহস জোগাচ্ছিলেন বাবা। বলেছিলেন, ‘তুমি আমার ফাইটার গার্ল, লড়াই করো।’ মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা মেয়েটিও কথা দিয়েছিল, হাল ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছিল সে। কিন্তু সব লড়াইয়ে জয় আসে না। ডেঙ্গুর সঙ্গে সেই লড়াইয়ে হেরে গেছে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাফিয়া হাসিন আরোশী। তিন মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া বাবা-মা ঘরে ফিরেছেন দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। সঙ্গে নেই তাঁদের বড় মেয়ে, প্রাণের আরোশী।
হাসানুজ্জামান ও শারমীন আক্তার দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছিল আরোশী। তার বয়সী অন্যদের মতোই পড়াশোনা, স্বপ্ন আর শখ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল তার জীবন। মিরপুরের একাডেমিয়া স্কুলের শিক্ষার্থী আরোশী পড়ত নবম শ্রেণিতে। তার ছোট দুই বোন সায়রা হাসিন সরোশী ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং সাকেরা হাসিন রোদশী প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তিন বোনের হাসি-আনন্দে ভরা পরিবারটিতে হঠাৎ করেই নেমে আসে অসুস্থতার ছায়া।
গত ১৯ অক্টোবর প্রথম জ্বর আসে আরোশীর। পরীক্ষা করানোর পর জানা যায়, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এর পরপরই জ্বরে পড়ে ছোট দুই বোনও। পরীক্ষায় তাদের শরীরেও ধরা পড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। একই পরিবারের তিন সন্তানের অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাবা-মা।
গত ১৯ অক্টোবর প্রথম জ্বর আসে আরোশীর। পরীক্ষা করানোর পর জানা যায়, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এর পরপরই জ্বরে পড়ে ছোট দুই বোনও। পরীক্ষায় তাদের শরীরেও ধরা পড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। একই পরিবারের তিন সন্তানের অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাবা-মা। প্রথম দিকে বাসায় রেখেই তিন মেয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তাঁরা। তরল খাবার খাওয়ানো, নিয়মিত প্লাটিলেটসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা—সবকিছুই চলছিল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। আরোশী খাবার খেতে পারলেও বারবার বমি হচ্ছিল। একপর্যায়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে।
চিকিৎসকের পরামর্শে ২২ অক্টোবর তিন মেয়েকেই ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু পরদিনই আরোশীর শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাকে বিআরবি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে দেওয়া হয় লাইফ সাপোর্ট।
জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে মেয়েকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করছিলেন বাবা। দন্ত চিকিৎসক হাসানুজ্জামান মেয়েকে বলেছিলেন, সে তাঁর ফাইটার, তাঁর চ্যাম্পিয়ন। মেয়েও বাবাকে আশ্বস্ত করেছিল, সে লড়াই চালিয়ে যাবে।
বাবার ভাষ্য, ‘মেয়ের প্লাজমা লিকেজ হচ্ছিল। কিডনি কাজ করছিল না। তখনো মেয়েকে বলেছি, তুমি আমার ফাইটার গার্ল, ফাইট করো। মেয়ে বলেছে, বাবা, আমি হাল ছেড়ে দেব না। আমি ফাইট করব।’ কিন্তু শারীরিক জটিলতা ক্রমেই বাড়ছিল। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টার মধ্যেও আরোশীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। ২৫ অক্টোবর বেলা ১টা ২৬ মিনিটে মারা যায় সে।
সন্তানকে হারানোর বেদনা কতটা গভীর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আরোশীর বাবা বুঝতে পারছিলেন, মেয়েকে হয়তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। মেয়ের কাছে তখন তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারার জন্য, তার অনেক শখ পূরণ করতে না পারার জন্য, কখনো বকাঝকা করার জন্য। মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা মেয়েটি তখনো বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু চোখের পানি আটকে রাখতে পারেনি। হাসানুজ্জামান জানান, মেয়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো অবহেলা করেননি। সেন্ট্রাল হাসপাতাল কিংবা বিআরবি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগও করেননি তিনি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও যে প্রিয় সন্তানকে হারাতে হলো, সেই অসহায়ত্বই এখন তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় বেদনা।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে বাবা ভেবেছিলেন, পাঁচজনই একসঙ্গে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাঁকে, বড় মেয়েকে ছাড়াই।
বাবার কণ্ঠে এখনো ফিরে আসে সেই স্মৃতি, ‘আমার ফাইটার, চ্যাম্পিয়ন মেয়েটা কথা রাখেনি। হাসপাতালে যাওয়ার দিনও বলেছিলাম, আমরা পাঁচজনই বাসায় ফিরব। কিন্তু একজনকে ছাড়াই বাসায় ফিরতে হলো।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত তিন বোনের মধ্যে দুজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও আরোশীর ফেরা হলো না। যে বাড়িতে তিন বোনের কোলাহলে দিন কাটত, সেখানে এখন বড় এক শূন্যতা। বাবার কাছে আরোশী শুধু একটি নাম নয়, সে তাঁর ফাইটার, তাঁর চ্যাম্পিয়ন—যার লড়াইয়ের গল্প থেকে যাবে, কিন্তু যার হাত ধরে আর কোনো দিন বাড়ি ফেরা হবে না।



