আজ নিজের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার দিন

সারাক্ষণ মুঠোফোনে বার্তা দেখা, কাজের চাপ সামলানো, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখতে দেখতে কি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন? তাহলে আজ একটু বিরতি নিতেই পারেন। নিজের পছন্দের খাবার খাওয়া, প্রিয় সিনেমা দেখা কিংবা সব ব্যস্ততা পাশে রেখে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেওয়া—এভাবেও কাটানো যায় নিজের সঙ্গে সুন্দর কিছু মুহূর্ত।
নিজের মতো করে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর ভাবনা থেকেই পালিত হয় ‘হারমিট ডে’ বা একান্তে থাকার দিন। দিনটি মনে করিয়ে দেয়, পরিবার, বন্ধু ও কাজের জন্য সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজের জন্যও কিছুটা সময় রাখা প্রয়োজন। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক সময় নিজের পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মনের চাওয়াগুলোকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যাই। অথচ নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার একটি উপায় হতে পারে।
একা থাকা মানেই মন খারাপ করে থাকা কিংবা নিঃসঙ্গতায় ভোগা নয়। কখনো কখনো মানুষের ভিড় থেকে দূরে গিয়ে নিজের মতো করে সময় কাটানোও স্বস্তি এনে দেয়। কেউ নিরিবিলিতে বই পড়তে ভালোবাসেন, কেউ পছন্দের গান শুনে আনন্দ পান, আবার কারও কাছে এক কাপ চা হাতে বারান্দায় বসে থাকা কিংবা জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখাই প্রশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। নিজের পছন্দের কাজগুলো করার জন্য সব সময় বিশেষ কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন হয় না।
যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময় মুঠোফোনে কাটান, তাদের জন্য এই দিনটি হতে পারে কিছুক্ষণের জন্য ডিজিটাল জগৎ থেকে বিরতি নেওয়ার সুযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখার অভ্যাস কিংবা প্রতিটি বার্তার দ্রুত উত্তর দেওয়ার চাপ থেকে সাময়িকভাবে দূরে থাকা যায়। এতে নিজের প্রয়োজন, অনুভূতি ও পছন্দের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন মাথায় রেখে মুঠোফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাই ভালো।
একান্তে সময় কাটানোর ধারণার সঙ্গে নির্জনবাসেরও সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে অনেক সাধক ধর্মীয় সাধনা কিংবা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে একান্তে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে লোকালয় থেকে দূরে বসবাস করতেন। তাঁদের বলা হতো নির্জনবাসী। বর্তমানে অবশ্য একা থাকার কারণ আরও বিচিত্র। কেউ মানসিকভাবে সতেজ হতে চান, কেউ নিজের ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে চান, আবার কেউ প্রতিদিনের কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে সাময়িক স্বস্তি খোঁজেন।
তবে নিজের ইচ্ছায় কিছু সময় একা থাকা আর দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভোগা এক বিষয় নয়। নিরিবিলিতে সময় কাটানো কারও জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা মানসিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী একান্তে থাকার পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য থাকলে জীবন আরও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
‘হারমিট ডে’ পালনের ধারণার সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের সাধক সেন্ট কোলম্যান ম্যাক ডুয়াগের নামের যোগসূত্রের কথাও প্রচলিত রয়েছে। ক্যাথলিক গির্জায় ২৭ অক্টোবর তাঁর স্মরণদিবস পালন করা হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ষষ্ঠ শতকে আয়ারল্যান্ডের গলওয়ে অঞ্চলে জন্ম নেওয়া সেন্ট কোলম্যান ঈশ্বরের সঙ্গে একান্তে সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে বারেন অরণ্যে সাত বছর নির্জনে কাটিয়েছিলেন। তাঁর এই জীবনযাপনের সঙ্গে নির্জনবাসের ধারণার মিল রয়েছে।
সেন্ট কোলম্যানের স্মরণদিবসের কাছাকাছি সময়ে পালিত হয় হারমিট ডে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও চারপাশের কোলাহল থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিয়ে নিজের জন্য সময় রাখার বিষয়টিই এ দিনের মূল ভাবনার সঙ্গে যুক্ত।
দিনটি উপভোগ করতে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। চাইলে কিছু সময়ের জন্য মুঠোফোনের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখতে পারেন। পছন্দের কোনো সিনেমা দেখতে পারেন, প্রিয় খাবার আনিয়ে নিতে পারেন কিংবা নিজের হাতে বিশেষ কিছু রান্না করতে পারেন। এক কাপ চা বা কফির সঙ্গে প্রিয় বই পড়া, পছন্দের গান শোনা কিংবা ঘরের জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করাও হতে পারে সময় কাটানোর সুন্দর উপায়।
যারা বাইরে সময় কাটাতে ভালোবাসেন, তারা নিরিবিলি কোনো জায়গায় হাঁটতে যেতে পারেন। আবার ঘরে থাকতে পছন্দ করলে আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া কিংবা নিজের শখের কোনো কাজ করার সুযোগ নিতে পারেন। চাইলে ডায়েরিতে মনের কথা লিখতে পারেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গুছিয়ে নিতে পারেন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট কাজ ছাড়াই নিজের ভাবনাগুলোকে সময় দিতে পারেন।
সব সময় ব্যস্ত থাকতে হবে কিংবা প্রতিটি মুহূর্তকে কোনো কাজে লাগাতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কখনো কখনো কাজের বিরতি নেওয়া, নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করা কিংবা নিজের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করাও প্রয়োজন। নিজের পছন্দের কাজ করার জন্য আলাদা সময় রাখলে দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে।



